ডিবেট কি? ডিবেট মানেই কি শুধু তর্ক-বিতর্ক বা চিৎকার করে কথা বলা? না, এটি এক ধরনের শিল্প, যেখানে যুক্তির শক্তি দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করা যায়। কল্পনা করুন, আপনি একটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন সামনে অগণিত চোখ আপনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, আপনার চারপাশে উচ্চারিত প্রত্যেকটি শব্দ কানে ধরা পড়ছে। এই মুহূর্তেই আপনি শুধু নিজের বক্তব্য দিচ্ছেন না, বরং আপনি যা ভাবেন, যা অনুভব করেন, কিভাবে যুক্তির আলোয় নিজের অবস্থান তৈরি করেন সেই সবকিছুর সমষ্টিই আপনার প্রকৃত পরিচয়। যুক্তি হলো সেই অস্ত্র, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে আপনার চিন্তাধারা, ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তা অন্যদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই, আসুন জেনে নেই কীভাবে যুক্তির মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং ডিবেটের দক্ষতা শক্তিশালী করে তোলা যায়।
তর্ক-বিতর্ক ছাড়াও ডিবেটের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রতিযোগিতামূলক ভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে যেমন: এখানে দুইটা দল থাকবে, একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বজায় রেখে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থেকে একটি প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করা হবে। একটি পক্ষ প্রস্তাবনাকে সমর্থন করেন আরেকটি পক্ষ প্রস্তাবনার বিরোধিতা করবেন। কিন্তু পরিশেষে তারা একটি ফলাফল পৌঁছায়। আর একটি দল জিতে যায় এবং অন্য দল পরাজিত হয়। তবুও পক্ষ-বিপক্ষ নিজের যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং যুক্তিসঙ্গত একটা আলোচনা সৃষ্টি করে যা বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য। এমনকি এ দৃশ্য দেখতে যেমন ভালো লাগে তেমনি এর থেকে অনেক ভালো কিছু শেখা যায়।
বিতর্ক নিয়ে আমাদের সমাজে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ রয়েছে। সাধারণভাবে, বিতর্ক নিয়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় যেমন, কখনো ইতিবাচক আবার কখনো নেতিবাচক। বিতর্ক সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের মধ্যে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো ”বিতর্ক মানেই ঝগড়া”। কিছু মানুষ এখনো মনে করে, বিতর্ক করলে অহেতুক সময় নষ্ট হয় সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আসলে বিতর্ক ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করার মনোবল দেয়,আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
আমরা অনেকেই ‘টেলিভিশন বিতর্ক’ বা ‘ছায়া সংসদ’ দেখে থাকতে পারি। এত সুন্দর উপস্থাপনা দেখে হয়তো মাঝে মাঝে মনেও হয় “ইশ”, যারা বিতর্ক করছে কত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলছে! আমিও যদি এভাবে যুক্তি দিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারতাম!”
বিতার্কিক হওয়া খুব কঠিন কিছু না। বিতর্ক হচ্ছে তর্কের খেলা। একটু কৌশল, শ্রম, চর্চার মাধ্যমে যখন আপনি আপনার কথা দ্বারা আপনার সামনের মানুষকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবেন তখন আপনিও হয়ে উঠতে পারবেন একজন সেরা বিতার্কিক! আর এভাবে যুক্তির আয়নার নিজের ভাবনাগুলোকে প্রতিফলিত করা যায়। এতে করে চিন্তা করার পরিসীমা বৃদ্ধি পায় এবং একটি বিষয়কে নিজস্ব চিন্তার বাইরে গিয়ে কীভাবে এবং কতভাবে ভাবা যায় তা একজন বিতার্কিকের থেকে ভালো কেউ বলতে পারবে না।
- বিতর্ক চর্চার জন্য স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক ক্লাবে যুক্ত হওয়া।
- সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়া ও বেশি বেশি বই পড়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অথবা বন্ধুবান্ধব অথবা পরিবারের সামনে বক্তৃতা দিন। তাছাড়া নিজের বক্তৃতার ভিডিও করে দেখা এবং কোথায় উন্নতি করা যায় তা নির্ধারণ করা।
- বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা, বেশি বেশি বিতর্কে অংশগ্রহণ মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সাথে অভিজ্ঞতাও বৃদ্ধি করা।
ডিবেটের কিছু উপায়সমূহ:
- বিষয়গত জ্ঞান অর্জন- বিতর্ক করার জন্য প্রয়োজন যুক্তিযুক্ত তথ্য ভান্ডার। তাই উচিত প্রচুর গবেষণা করা। আর বিতর্কের প্রস্তাবনা ১৫ মিনিট আগেই দেয়া হয়, তখন সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করা। বিষয়বস্তু সম্পর্কে যত বেশি জানা থাকবে তত বেশি কথা যাবে। আর মনে রাখতে হবে তথ্যের উৎস যাচাই করে যুক্তি উপস্থাপন করা কোন ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার না হয়।
- যুক্তি গঠন ও খন্ডন- নিজের সঠিক যুক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষের যুক্তিকে খণ্ডন করা এবং বিচারকদের আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করা। তাছাড়া প্রতিপক্ষ কি ধরনের যুক্তি প্রদান করতে পারে সে বিষয়ে যথাযথ ধারণা রাখা এবং বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়া ।
- কাঠামোবদ্ধ বিতর্ক- বিতর্কের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সুগঠিত পরিকল্পনা করা যেমন: কোন যুক্তির পর কোন যুক্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ তা ঠিক করা। দাবি, প্রমাণ, ব্যাখ্যা এই তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করে বক্তব্য প্রদান করা একে বলে “ফ্রেমিং করা” ।
- আত্মবিশ্বাসী হওয়া- স্পষ্টতার সাথে কথা বলা এবং ভয় না পাওয়া। প্রতিপক্ষের কোন উত্তরে ঘাবড়ে না যাওয়া। বিতর্কে হারজিত একটি সাপেক্ষ ব্যাপার এখান থেকে জ্ঞান অর্জন করাটাই মুখ্য বিষয়।
- সময় ব্যবস্থাপনা করা- বিতর্কে সময় ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। কারণ সময়ের সাথে সাথে নিজের যুক্তি প্রয়োগ ও প্রতিপক্ষের যুক্তির সমালোচনা করাটাই মূল উদ্দেশ্য।
- কণ্ঠস্বরের তীব্রতা দেহভঙ্গি নিয়ন্ত্রণে রাখা- বিতর্কে আবেগ থাকা জরুরি।কারণ প্রত্যেকটি বিতর্কে প্রস্তাবনা এক ধরনের হয় না। তাই কখন উচ্চস্বরে, কখন মাঝারি স্বরে কথা বলতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করা। শব্দচয়নের ক্ষেত্রে গুরুগম্ভীর শব্দ ব্যবহার না করে সহজ ও সাবলীল শব্দ ব্যবহার করাই শ্রেয়।এতে শ্রোতারা সহজেই বক্তৃতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। শব্দের পাশাপাশি চোখের যোগাযোগ, হাতের অঙ্গভঙ্গি ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শারীরিক ভাষা দিয়ে বক্তব্যকে আরও দৃঢ় করে তোলা যায়।
- ভালো শ্রোতা হওয়া- প্রতিপক্ষ কি ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করছে মনোযোগের সাথে শোনা প্রয়োজনে সেই অনুযায়ী যুক্তি দেয়া।
- বিতর্ক বিশ্লেষণ করা- বিতর্ক বিশ্লেষণ নিজের দক্ষতাকে আরো উন্নত করে। যৌতিক চিন্তাভাবনা, সঠিক ও ভুল যুক্তি চিহ্নিত করা, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শ হওয়া যায়।
আর আপনি প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক করেন আর না করেন প্রতিনিয়ত আপনি যে কথাগুলো বলছেন, যে বিষয়গুলো প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন সে বিষয়গুলো যেন যুক্তি দিয়ে দাবি করেন।আপনি যদি মনে করেন “আপনি ভাল মানুষ” আপনি কেন ভালো মানুষ হিসাবে নিজেকে দাবি করছেন তা যদি যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন তাহলে অন্যরাও মানতে রাজি হবে যে আপনি একজন ভালো মানুষ।
আর উপরোক্ত কৌশলগুলো আয়ত্ত এবং প্রয়োগের ফলে আমি মনে করি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুন্দরভাবে বিতর্ক উপস্থাপন করা সম্ভব। তাহলে আর কিসের অপেক্ষা! আজ থেকেই বিতর্কের চর্চা শুরু করে দিন। কে জানে, হয়তো আপনার মাঝেও লুকিয়ে থাকতে পারে অভাবনীয় এই প্রতিভা।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক
মোছা:জান্নাতুল ফেরদৌসী রিচি
ইন্টার্ন,কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
