শীত এমন একটি সময় যখন হাজারো কাজের চাপকে ফেলে, চিন্তা কে দূরে ঠেলে দিয়ে, শীতে জবুথবু হয়ে না থেকে মানুষ ব্যস্ত থাকে এই সময় টাকে উপভোগ করতে। এক এক সংস্কৃতি’র মানুষ এক এক রকম করে এই সময়টাকে উপভোগ করে থাকেন। আমাদের দেশী সংস্কৃতিতে মানুষজন পরিবার-পরিজন একত্রিত হওয়া, গ্রামের বাড়ীতে ঘুরতে যাওয়া এগুলোকে উপভোগ্য হিসেবে নিয়ে থাকেন, আবার দেশের বাইরের মানুষ অন্যরকমভাবে শীতকাল উপভোগ করে থাকেন। শীতকালে আমাদের দেশে এসময় সব স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকার কারণে বাচ্চাদের হুল্লোড়ে পুরো ঋতু মেতে ওঠে।
ভারতের শীত উৎযাপন
শীতের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় পৌষ মেলা। যেখানে তাদের অংগরাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন একত্রিত হয়ে শীত উৎযাপন করে থাকেন। এছাড়া সেই মেলাতে নানান রকম খাবার, পিঠা, বিভিন্ন খেলা’র ও চিত্রাংকন প্রতিযোগীতা’র ও আলাদাভাবে আয়োজন করা হয়ে থাকে।
জাপানের শীতকালীন উৎযাপন
“সাপ্পোরো স্নো” ফেস্টিভ্যাল ১৯৯০ সাল থেকে প্রচলিত। হাই-স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী’রা শুরুতে মাত্র ছয়টি বরফের ভাস্কর্য দিয়ে এই প্রতিযোগিতা শুরু করেছিল এবং বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজারের ও বেশি ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়ে থাকে। প্রায় প্রতিবছর ২ মিলিয়নের মতো অতিথি আসেন সেসব ভাস্কর্য উপভোগ করতে, তবে তার জন্যে ঠিকঠাক উষ্ণতা এবং পোশাক ব্যবস্থা করে আসতে হয়, তবেই সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।
আফ্রিকা, ইরান, পেরু, ইকুয়েডরসহ চীনে শীত উৎযাপন
আফ্রিকা তে নতুন ফসল এর আগমন ঘটার কারণে এই সময়ে তারা ফসল এর আবির্ভাব কে উৎযাপন করেন। পরিবারের প্রধান কর্তা সর্বপ্রথম ফসলের স্বাদ গ্রহণ করার পর বাকী সদস্য রা অনুমতি পান স্বাদ নেয়ার। আবার কিছু জায়গায় শাসক প্রথম স্বাদ নিয়ে কলাবশ বা বুনো লাউ থেঁতলে প্রজাদের স্বাদ নেয়ার অনুমতি দিয়ে থাকেন। আবার চীনে শীত কে নিবারন করার জন্যে তাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী তারা গরম খাবার খেয়ে থাকেন শরীরের উত্তাপ ধরে রাখার জন্যে। ইরান, পেরু ও ইকুয়েডরে এই সময় তারা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী দেবতার সম্মানে নানান উৎসব উৎযাপন করে থাকেন।
শীতকালীন বিভিন্ন ইভেন্ট
শীতকালে বিভিন্ন নাচ, গানের ইভেন্ট কার না ভালো লাগে। বিভিন্ন দেশ যেমন ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশ সহ আমাদের এশিয়ার দেশগুলোতে ও এসময় নাচ, গান, ইভেন্ট, ট্রাভেল এর ইভেন্ট গুলোও শুরু হয়। ট্রাভেলাররা এই সময় পর্বত আহরণ করতে পছন্দ করেন, অনেক বিয়ের, জন্মদিন, অ্যানিভার্সেরীর মতো অনুষ্ঠান অনেকেই অনেক বড় করে এই সময় উৎযাপন করে থকেন, সুতরাং ট্রাভেল, ইভেন্ট এর ব্যবসা গুলো এই সময়ে অনেক চমকপ্রদ পর্যায়ে চলে যায়।
শীতের নানান খাবার ও দেশী উৎযাপন
এই সময়ে আমাদের দেশের ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, বেগুন, টমেটো, বিভিন্ন মাছ, বিভিন্ন স্বাদের ফল, খেজুর থেকে রস আহরণ, বিভিন্ন শাক-সবজি ভীষণভাবে শীতকালকে রঙিন করে। এই সময়ে মানুষ পিঠা, পায়েস, কেক খেয়ে থাকেন। গ্রামের মানুষেরা জারিগান, কবিগান, মঞ্চনাটক ও মেলার আয়োজন করেন। ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট, ফুটবল, বহিরঙ্গন খেলা ও পিকনিক এর আয়োজন করা হয়। নতুন ধান ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় নানান পিঠা, যেমন: ভাপা, চিতই, পুলি, তেল, চুশনী, পাটিসাপটা, দুধ, নকশী, পোয়া, মালপোয়া, পাকন সহ নানান সুস্বাদু পিঠা বানানো হয়। সুইজারল্যান্ডে’র সুইস ফন্ডু, ভিয়েতনামীদের ন্যুডলস স্যুপ ফো, দক্ষিণ কোরিয়ার রেড বিনস এর পরিজ, চীনে “মাংস, সী – ফুড, সবজি, ন্যুডলস, চীনা সস দিয়ে তৈরি হটপট” খাওয়া হয়। ইউক্রেনের বোর্শ, ফ্রান্সের অনিয়ন স্যুপ, ইতালির টরতেলিনি ইন ব্রোডো, জাপানের ওডেন, স্পেন এর চুরোস ও চকলেট এসময় পুরো বিশ্ব কে প্রাচুর্যে ভরপুর ও উৎসবমুখর করে তোলে।
শীতকালের স্নিগ্ধতা অন্য সব ঋতুকে হার মানায়। ব্যাপক শীতের ভীড়েও পুরো বিশ্ব এই সময়ে উৎসবমুখর উৎযাপনে হারিয়ে যায়। শীতকাল প্রতিবার এসে অজস্র স্মৃতিমুখর আনন্দ ও স্বল্প বেদনা মানুষকে বিলিয়ে দিয়ে যায়।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে এখানে, ক্লিক করুন।
লেখিকা
তাহসিন তাকিয়া হক
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট,
YSSE.
