বলুন তো, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো আপনাকে কোনটি দিচ্ছে: বেশি কনটেন্ট নাকি ভালো কনটেন্ট?

একসময় দর্শকরা সিনেমা উপভোগের জন্য প্রেক্ষাগৃহে যেতেন, কিন্তু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব তাদের বিনোদনের অভিজ্ঞতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ডিজনি+ এর মতো বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি হইচই, বঙ্গো, চরকির মতো দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সিনেমা, টিভি শো এবং অরিজিনাল কনটেন্ট তৈরি করছে।

তবে দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর এই তীব্র প্রতিযোগিতা আমাদেরকে একটি গভীর প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয় আর সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, “এই যুদ্ধে দর্শকরা আসলে কি পাচ্ছেন?” আজকে আমরা একটু গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করব মূলত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো দর্শকদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারছে বা তারা আদৌ সন্তুষ্ট করতে পারছে কিনা? পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলো কি দর্শকদের পছন্দের উপর সিনেমা, টিভি শো তৈরি করছে নাকি শুধুমাত্র নিজেদের ব্যবসা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

প্রতিটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দ্রুত পরিবর্তনশীল দর্শকদের পছন্দ এবং চাহিদার কথা মাথায় রেখে কনটেন্ট সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ, নেটফ্লিক্স অরিজিনাল সিরিজ এবং সিনেমার জন্য সুপরিচিত। তাদের “স্ট্রেঞ্জার থিংস“, “মানি হাইস্ট“, “স্কুইড গেম” এর মতো শো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

অন্যদিকে, অ্যামাজন প্রাইম বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক সিনেমা এবং শো তৈরির দিকে বেশি মনোযোগী। একইভাবে হইচই এবং বঙ্গো বাংলা কনটেন্টের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য তারা “তাকদীর“, “মহানগর” এর মতো স্থানীয় কনটেন্ট তৈরি করছে।

প্ল্যাটফর্মগুলোর কৌশলের দিকে যদি মনোযোগ দেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে কিছু প্ল্যাটফর্ম সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে দর্শকদের কনটেন্ট দেখার সুযোগ দেয়, আবার কিছু প্ল্যাটফর্ম বিনামূল্যে শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন দেখানোর মাধ্যমে তাদের কনটেন্ট উপলব্ধ করে। এই ধরনের প্রতিযোগিতা দর্শকদের জন্য ভালো কারণ তারা কম খরচে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট উপভোগ করতে পারছেন।

তবে এই ধরনের প্রতিযোগিতার ফলে প্ল্যাটফর্মগুলোর কন্টেন্টের মান নিয়েও সংশয় দেখা যায়। কিছু প্ল্যাটফর্ম দর্শকদের পছন্দের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে কেবলমাত্র জনপ্রিয় ধারার কনটেন্ট তৈরি করছে। ফলে দর্শকরা গুণগত মানসম্পন্ন এবং বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট সব সময় পাচ্ছেন না।

এছাড়াও, একজন দর্শক যদি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট উপভোগ করতে চান, তাহলে তাকে একাধিক সাবস্ক্রিপশন নিতে হচ্ছে। এতে মাসিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের  আলাদা আলাদা সাবস্ক্রিপশন ফি দর্শকদের চিন্তা করতে বাধ্য করছে তারা কি মানসম্মত কনটেন্ট এর জন্য বেশি সাবস্ক্রিপশন ফি দেবেন, নাকি ফ্রিতে মানহীন কনটেন্টের দিকে ঝুঁকবেন?

আরেকটি বড় সমস্যা হলো কনটেন্টের অতিরিক্ত সরবরাহ। প্রতিদিন শত শত নতুন শো এবং সিনেমা যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু দর্শকরা কী দেখবেন তা নির্বাচন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই “কনটেন্ট ওভারলোড” দর্শকদের সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত করছে।

কিছু প্ল্যাটফর্ম অবশ্য ইতিমধ্যে “বান্ডেল” অফার শুরু করেছে, যেখানে একটি সাবস্ক্রিপশনেই একাধিক প্ল্যাটফর্মের সেবা পাওয়া যায়। এই ধরনের উদ্যোগ দর্শকদের খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাছাড়া AI-চালিত সুপারিশ সিস্টেম উন্নত করে দর্শকদের পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট খুঁজে পেতে সহায়তা করা যেতে পারে।

এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রকৃতপক্ষেই দর্শকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দর্শকরা এখন তাদের পছন্দমতো কনটেন্ট ঘরে বসেই সিনেমা হল বা থিয়েটারের মতো উপভোগ করতে পারছেন। প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের বিনোদনের ধরন সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দর্শকদের কেবল সংখ্যা হিসেবে না দেখে, তাদের পছন্দ, চাহিদা এবং প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

প্ল্যাটফর্মগুলো যদি সত্যিকার অর্থেই দর্শকদের পছন্দ এবং চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে প্ল্যাটফর্মগুলোর এই “যুদ্ধ” দর্শকদের জন্য বিনোদনের এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করবে। শেষ পর্যন্ত, এই প্রতিযোগিতায় আসল বিজয়ী হওয়া উচিত দর্শকরাই, যারা মানসম্মত, বৈচিত্র্যময় এবং সাশ্রয়ী কনটেন্ট পাওয়ার অধিকার রাখেন।

এই ধরনের আরও ব্লগ পড়তে এখানে. ক্লিক করুন।

লেখক, 

মো:কাইয়ুম 

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং বিভাগ 

YSSE