সমাজসেবা শুধু একটি কাজ নয়, এটি একটি দায়িত্ব এবং মানবিকতার প্রকাশ। সমাজের অসহায়, দুস্থ কিংবা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জীবনে সামান্য হলেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা এই মানসিকতাই একজন প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবীকে আলাদা করে তোলে।
আজ আমরা কথা বলেছি সমাজসেবা ও মানবকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত একজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সাদিরা আমিরীর সঙ্গে। জানব তার সমাজসেবার সাথে যুক্ত হওয়ার গল্প, কাজের পথে পাওয়া চ্যালেঞ্জ, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার কিছু উদ্যোগ এবং তরুণদের জন্য তার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত আপনার জার্নিটা যদি সংক্ষেপে শেয়ার করতেন কীভাবে সমাজসেবা ও মানবকল্যাণের কাজে যুক্ত হলেন?
সত্যি বলতে গেলে ছোটবেলায় আমার অত বেশি ধারণা বা অভিজ্ঞতা ছিল না যে আমাদের সমাজে বা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সমাজসেবা সংগঠন থাকতে পারে এবং সমাজসেবকরা মানুষের দ্বারগোড়ায় সাহায্য পৌঁছে দিতে পারে।
পরে যখন আমি স্কুলের শেষ পর্যায়ে, অর্থাৎ ক্লাস টেনে পড়ি এবং এস.এস.সি দেওয়ার আগে, তখন আমাদের স্কুলে একটি সমাজসেবা সংগঠন ব্লাড ডোনেশন নিয়ে কাজ করতে আসে। তারা আমাদের ক্লাসে এসে সমাজসেবা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দেয়। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে আমি ওই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। এরপর বিএনসিসি ও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে হতে সমাজসেবা সম্পর্কে আরও জানতে থাকি।
পরবর্তীতে যখন আমি এইচ.এস.সি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন আমি আন্তর্জাতিক সংগঠন লায়ন্স ক্লাব অফ চিটাগং–এর সঙ্গে যুক্ত হই। এই সংগঠনের মাধ্যমে চক্ষু চিকিৎসা, খতনা, রক্তদান, দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বস্ত্র বিতরণ এবং ফ্রি চক্ষু অপারেশনসহ বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক কাজ করা হয়।
তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই যখন রাস্তার ফুটপাতে অসহায় ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখতাম, তখন থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল তাদের জন্য কিছু করার। আমি চাইতাম তারা পড়ালেখা শিখুক, স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানুক এবং একটি ভালো জীবনের সুযোগ পাক। স্কুল ও কলেজে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে এই কাজগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ধীরে ধীরে সমাজসেবার প্রতি আমার আগ্রহ এবং যুক্ত হওয়া শুরু হয়।
আপনার কাজের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এবং সেখান থেকে শেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কী?
আমার কাজের পথে বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল যখন ভারতে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বাঁধ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তার ফলে বাংলাদেশের ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল।
এই সময়টা আমাদের দেশের মানুষের জন্য যেমন কঠিন ছিল, তেমনি আমাদের সংগঠনের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা চেয়েছিলাম বন্যা কবলিত মানুষদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতে এবং তাদের জন্য ফ্রি চক্ষু চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তখন আমাদের সংগঠনে পর্যাপ্ত সদস্য ছিল না, টিম সমন্বয়ও ঠিকভাবে ছিল না এবং অর্থেরও সংকট ছিল। সঠিক পরিকল্পনার অভাবের কারণে আমরা সেই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
এটি আমার জীবনের একটি বড় ব্যর্থতা এবং অভিজ্ঞতা। সেখান থেকে আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি। প্রথমত, শুধু আবেগ দিয়ে কাজ শুরু করা যায়, কিন্তু কাজকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সঠিক দায়িত্ব বণ্টন, বিকল্প পরিকল্পনা এবং সমস্যা সমাধানের কৌশল জানা জরুরি। তৃতীয়ত, কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া মানে হেরে যাওয়া নয় বরং এটি নতুনভাবে শেখার সুযোগ দেয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখেছি যে ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো পরিস্থিতি আসে, তাহলে আমরা আরও প্রস্তুত থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।
এমন একটি সফল উদ্যোগের গল্প বলবেন কি, যা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনেছে?
আমাদের মতো স্বেচ্ছাসেবীদের মূল উদ্দেশ্যই হলো একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা।
আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল একটি পরিবারের মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা। সেই মেয়েটির মা পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিলেন না। তখন আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ফান্ড সংগ্রহ করি এবং নিজের পক্ষ থেকেও সাহায্য করার চেষ্টা করি। আমরা বিয়ের শাড়ি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা করে দিই।
আরেকটি উদ্যোগ ছিল কয়েকটি পরিবারের ছেলেদের খতনার ব্যবস্থা করা। অনেক পরিবারের পক্ষে খতনার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। তখন আমরা তিনটি পরিবারের ছেলেদের ফ্রিতে খতনা করানোর ব্যবস্থা করি।
এছাড়া আমরা চেষ্টা করেছি এমন অনেক মানুষকে সাহায্য করতে, যারা প্রতিদিন ঠিকমতো খাবারও পায় না। অনেক সময় আমরা টিম মিলে তাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। রমজান মাসেও আমরা এই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাই। ভবিষ্যতেও এই কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে।
একজন সফল ফিলানথ্রপিস্টের জন্য কোন গুণাবলি ও মানসিকতা সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
আমি মনে করি একজন ফিলানথ্রপিস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো ধৈর্য। যদি কোনো কাজে ব্যর্থ হয়ে আমরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলি এবং বলি যে আমরা আর পারব না, তাহলে সমাজসেবা করা সম্ভব হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইতিবাচক মানসিকতা। একজন সমাজসেবীর কখনো ভাবা উচিত না যে এই কাজ করে তার ব্যক্তিগত লাভ কী হবে বা আর্থিকভাবে সে কতটা লাভবান হবে।
আমাদের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সেবা করা। যদি এই মানসিকতা থাকে এবং ধৈর্য ধরে কাজ করা যায়, তাহলে সমাজসেবার মাধ্যমে অনেক মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের জন্য সমাজসেবা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
আমার পরামর্শ থাকবে যে আমাদের সবারই সমাজসেবার সাথে যুক্ত হওয়া উচিত। আমরা যেমন নিজের সফলতার জন্য চেষ্টা করি, তেমনি চাইবো আমাদের দেশও সফল হোক এবং দেশের মানুষও ভালো থাকুক।
আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, তাহলে সমাজসেবা যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি আমাদের ব্যক্তিগত উন্নয়নও হবে।
দেশের উন্নয়ন মানেই আমাদের উন্নয়ন। দেশের মানুষের ভালো থাকা মানেই আমাদের ভালো থাকা। তাই আমরা যা কিছু করব, সেটা মন থেকে করা উচিত।
যদি এই মানসিকতা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে সমাজ এবং দেশ – দুটোরই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
আমাদের এই ধরনের অনুপ্রেরণামূলক গল্প ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক ব্লগ পড়তে Ysseblog ওয়েবসাইট এবং আমাদের Facebook ব্লগ পেজের সাথেই থাকুন। সামনে আসছে আরও নতুন গল্প, নতুন মানুষ এবং নতুন অনুপ্রেরণা।
এরকম আরোও ব্লগ পড়তে, এখানে ক্লিক করুন।
লেখক
আহমেদ আফিফ মুরাদ
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
