সঠিক পরামর্শ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অন্যদেরকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে ও জীবনে উন্নতি  করতে সহায়তা প্রদান করেন একজন দক্ষ ট্রেইনার এবং তার অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা। যার প্রধান ফোকাস থাকে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জ্ঞান বিতরণের উপর।

আমাদের আজকের অতিথি ‘মাশাহেদ হাসান সীমান্ত’ ও এর ব্যাতিক্রম নয়। তিনি সর্বক্ষণ বিভিন্নভাবে মানুষের প্রশিক্ষণ বা কাউন্সিলিংয়ের  মাধ্যমে স্কিল ডেভেলপমেন্ট করতে সচেষ্ট। তিনি মনে করেন- যখন কেউ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন, তখন তার জন্য ‘সাদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে তিনটি পথ খোলা থাকে যার ফলে মৃত্যুর পরেও এর প্রতিদান পেতে থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে – উপকারী জ্ঞান। তিনি যে ট্রেনিং বা কাউন্সিলিং গুলি অফার করেন তা এরই অংশ। তিনি আরোও যুক্ত করেন যে, তার প্রতি মুহূর্তের  কাজকে ইবাদত হিসেবে দেখেন। আল্লাহ তায়ালা কখনো তার কাজকে সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন, তাহলে তার থেকে বড় ভাগ্যবান আর কেউ হবেন না। 

চলুন তাহলে ইন্টারভিউ সাবটিমের আয়োজিত এমন একজন গুনী ব্যাক্তির (পার্ট-২) অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তার মুখেই শোনা যাক। 

YSSE: একজন মানুষ নিজেকে সহজ করে নিতে কিভাবে ‘ লাইফকে ইজি’ করে নিতে পারে?

লাইফ সহজ হয় যখন আমরা নিজেকে চিনি এবং নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করি।আমি জানি আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী – যেমন, বাবার অসুস্থতার সময় আমি নিঃসন্দেহে তাঁর সুস্থতাকেই অগ্রাধিকার দিই।নিজেকে সহজ করার তিনটি অভ্যাস আমি অনুসরণ করি:

  • নিজের কাছে নিজের প্রত্যাশা পরিষ্কার রাখা।
  • ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যকে কষ্ট দিলে তা স্বীকার করা।
  • নিজেকেও ক্ষমা করতে শেখা।

এছাড়া আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ক্লারিটি খুব শক্ত – জানি কীভাবে আগোবো। আমার চিন্তা পরিষ্কার বলেই আমার কথা গুছানো। আমি যদি আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, তবুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারব।

আসলে, জীবন কারোই সহজ নয়; সহজ হয় তখনই, যখন আমরা বাস্তবতাকে মেনে নিই ও নিজেকে চিনি।

YSSE: ভবিষ্যতে আপনি কোন  নতুন উদ্যোগ বা পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছেন?

ভবিষ্যতের মূল ভিশন হলো – বাংলাদেশের একটি Talent Pool তৈরি করা। যেখানে দেশের তরুণরা নিজেদের স্কিল অনুযায়ী শেখার সুযোগ পাবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।এই ট্যালেন্ট ব্যাংকে তথ্য থাকবে –  দেশের ২০ কোটির মধ্যে কতজন মানুষ কোন ক্ষেত্রে দক্ষ। এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।

YSSE: অনেক তরুণই এখন হতাশ, তারা লক্ষ্য স্থির করতে পারছে না, তাদের জন্য কি উপদেশ থাকবে?

যারা লক্ষ্য স্থির করতে পারছে না, তাদের জন্য তিনটি পরামর্শ –

  • রোল মডেল খুঁজুন: যাদের জীবন, চিন্তা বা কাজ আপনাকে অনুপ্রাণিত করে। তবে সচেতন থাকবেন, রোল মডেলের সব দিক আপনার জন্য প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে।
  • মানুষের সঙ্গে মিশুন: যত বেশি মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তত বেশি ইনফরমেশন ও সুযোগ পাবেন, যা আপনাকে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করবে।
  • অ্যাকশন নিন: লক্ষ্য স্থির করা শুধু চিন্তার কাজ নয়; বাস্তবে কাজ শুরু করুন। যে ক্ষেত্রটিতে যেতে চান, সেখানে অভিজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করুন, মাঠে নামুন – তাতেই স্পষ্টতা আসবে।

YSSE: পাবলিক স্পিকিং এ ভয় জয় করার জন্য,  কিভাবে অনুশীলন করা উচিত? 

পাবলিক স্পিকিং আসলে দুইটি কাজের যোগফল। Developing your thought and delivery your thought. আপনি এই দুটো বিষয়ে যত বেশি প্রেকটিস করবেন, ততই আপনার জন্য বেটার হবে। একটি প্রেক্টিস স্ট্যাটেজি হচ্ছে – একটা টপিক নিবেন, সেটার উপর নিজেকে এক মিনিট সময় দিবেন। আর সে বিষয়ে তিন মিনিটে আপনি কথা বলতেন তা বুলেট পয়েন্টে একটা ডায়েরিতে লিখে নিয়ে তার আউটলাইন ডেভেলপমেন্ট করবেন। রেগুলার যদি ৩-৬ মাস এই কাজটা করতে পারেন তাহলে খুব ফ্যান্টাসিক ওয়েতে এই জায়গাটায় ডেভেলপ করে ফেলতে পারবেন। 

YSSE: আপনি কিভাবে টাইম ম্যানেজমেন্ট করেন? একসাথে এতগুলো দায়িত্ব কিভাবে সামলান? 

আমার টাইম ম্যানেজমেন্টের ছোট একটা উদাহরণ হচ্ছে -প্রতিমাসে ১৫-২০ টা কন্টেন্ট আমার ইউটিউব চ্যানেলে যায়, আর এই কাজের জন্য পুরো মাসে আমি টোটাল সময় দিয়ে থাকি মাত্র পনেরো ঘন্টা। যে এজেন্সিকে কাজগুলো আমি দেই তা একটা প্যাকেজে এর মাধ্যমে করি যেনো আমার কাজ সময়সাপেক্ষ হয়। আর আমার টাইম স্ট্যাটেজি হচ্ছে না বলতে পারা, আমি প্রচুর মানুষকে না বলি। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধু প্রায়োরিটি কাজগুলোকে সময় দিয়ে। যে সমস্ত মানুষ, কাজ এবং চিন্তা আমার সময় নষ্ট করবে, সেগুলা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করি।  তো এইভাবেই আসলে টাইমটা ম্যানেজ করে থাকি। 

YSSE: পারসোনাল গ্রোথ বা আত্নউন্নয়নের জন্য আপনি কি ধরনের বই পরামর্শ দিবেন? 

যে বই আপনাকে এট্রেক্ট করে,  সেটাই ভালোভাবে পড়েন। সব বই সবার জন্য না, তবে এইক্ষেত্রে আমাকে কয়েকটি বই খুব ভালো ইমপেক্ট ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ফরটি এইট লোস অফ পাওয়ার, সেল সুব্রত ভাগচীর ও দ্যা ইনফিনিট গেম বায় সায়মন সিনেক। এছাড়াও আমি পারসোনাল গ্রোথের বাহিরে ডক্টর ইউনূস স্যারের, জোসেফ ইস্টগলিজ ওয়াল্ডের একজন রিনাউন্ড ইকোনোমিস্ট, হুমায়ুন আহমেদ স্যারের বইগুলাও পরি। যে বইগুলা আপনাকে আকৃষ্ট করে, সেইগুলা পড়ে আগে অভ্যাস বাড়ান, পরবর্তীতে আপনি ডাইভার্সসিফাই করেন। 

YSSE: বর্তমান চাকরি বাজার বা নরমাল নিজস্ব ব্যবসায়ের জন্য স্কিলের প্রাপ্যতা কতটুকু? আর আপনার মতামত অনুযায়ী কোন স্কিল গুলো থাকাটা বেশি জরুরী? 

সত্যি কথা বলতে স্কিলের প্রাপ্যতা আমাদের খুবই কম। যেমন – মাইক্রোসফটের  নাম্বার ওয়ান লার্নি পার্টনার নেটকমে আমি তাদের ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট ট্রেইনার প্যানেলের মেম্বার ছিলাম। সেখানে আমাদের টার্গেট ছিল AI ট্রেনার রিক্রুট করা। তাদের আমরা শিখিয়ে ডেভেলাপ করব যেনো তারা অন্যসব অরগানাইজশনে ট্রেইনিং প্রভাইড করতে পারে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সব রিকুয়ারমেন্ট ম্যাচ করে চার – পাঁচ জন কোয়ালিভাইড ক্যান্ডিডেটকে রিক্রুট করব। কিন্তু আমরা পাঁচশো অ্যাপ্লিক্যাশনের মধ্যে মাত্র তিনজন কোয়ালিফাইড ক্যান্ডিডেট পাই। আসলে আমাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেকেই কমিউনিকেশন স্কিল বলতে শুধু বুঝে ইংলিশে কথা বলা জানতে হবে। আমাদের লেক অফ স্কিল এবং মাইন্ডসেট রয়েছে। 

আমাদের তিনটি টাইপ স্কিল থাকাটা জরুরি।  হার্ড বা ট্যাকনিক্যাল স্কিল যা কৌশল গুলোকে শিখতে হেল্প করে। কমিউনিকেশন,  প্রেজেন্টেশন,  পাবলিক স্পিকিং, নেগোশিয়েশন এইগুলো হচ্ছে সফট স্কিল। এই দুটো টাইপ স্কিল আমাদের অব্যশই জরুরি। তৃতীয়ত আমি যেটা বলি, সেটা হচ্ছে  ফিউচার স্কিল। যেমন: পৃথীবিতে এখন প্রায় এক লক্ষ্যে  AI tool আছে। সত্তর হাজারের বেশি কোম্পানি AI নিয়ে কাজ করছে আর সতেরো হাজার AI রিলেটেড স্টাট আপ আছে। যখন যেটা আসবে তখন সেটা ক্যাচ করা। তাই ক্যাচেবিলিটির দক্ষতা থাকাটাও অনেক জরুরি।

YSSE: যারা আপনার মতো প্রফেশন পারসিউ করতে চায়, তাদের জন্য  কি উপদেশ থাকবে? 

যারা কন্টেন্ট এবং থট প্রসেসিং এর মাধ্যমে ইম্পেক্ট তৈরি করতে চায়, তাদেরকে বলবো – নলেজ এক্সিপিরিয়েন্সটি বাড়ানোর জন্য । আমি শুরু করেছিলাম বিতার্কিক হিসাবে তারপর কন্টিনিউয়াসলি আমার নলেজ ডেভেলপ করছিলাম। এখনোও আমি আমার নলেজ গ্যাদারের একটি লং টাইম স্পেন্ড করি। এবং গোলটা সেট করাটা জরুরি, আপনি কি এটা ফুল নাকি পার্ট টাইম কোন প্রফেশন হিসেবে পারসিউ করতে চান।  সেভাবে আপনাকে কাজগুলো করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি বলবো ছোট জায়গা  থেকেই শুরু করাটা বেটার। আমি আস্তে আস্তে নিজেকে ডেভেলেপ করে এই পজিশনে আসছি। আপনি কোন লেভেলে স্টার্ট করতে চান এবং পরের স্টেপ্টা কোথায় রাখবেন এই দুইটি বিষয়ে ক্লিয়ার থাকতে হবে। যারা এই প্রফেশনটা পারসিউ করতে চান- এই জায়গা আছে এমন ব্যাক্তিদের লাইফ স্টোরি, স্ট্রগাল একটু শুনেন এবং ছোট করেই শুরু করেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করুন।যখন আপনি একটা মানুষকে কিছু দিবেন তখন আপনার থাকতে হবে আদারওয়াইজ আপনি দিতে পারবেন না। এই সবকিছুর সমন্বয়েই এই প্রফেশনকে পারসিউ করতে পারবেন।

“আজকে ইন্টারভিউতে সময় দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ, স্যার। আপনার অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য আমাদের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি আরও সমৃদ্ধ করবে সে আশা রাখছি” এবং আপনার আগামী দিন গুলোর জন্য আপনাকে শুভকামনা জানিয়ে আজকের মতো ইন্টারভিউ সাবটিম থেকে বিদায় জানাচ্ছি। ধন্যবাদ সকলকে।

এররকম ব্লগ আরো পড়লে, এখানে ক্লিক করুন

লেখক, 

ফারজানা রহমান 

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট। 

YSSE