গ্রামের নাম কলাপোতা, পূর্ববঙ্গের এক নিতান্ত অজপাড়াগাঁ। সেই গাঁয়ের মেয়ে ইন্দুবালা। বয়স খুব বেশি একটা নয়, হবে পনেরো কি ষোল। গায়ের রং দুধে আলতা, চোখ দুটো ডাগর ডাগর শরীরটা যেনো কলমিলতার মতো বেড়ে উঠেছে। শুধু বেড়েই উঠেছে কিন্তু নেই তেমন খেয়ালি ভাব। গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠোপথে, কখনো বা কারো পেয়ারা বাগানে কখনো বা তাল তলায় ঘুরতে থাকে মনের সুখে। বাড়ির মানুষ যাই বলুক ইন্দুবালার দাদি তাকে সবসময় আগলে রাখতো। দাদির থেকেই নানা মজার মজার খাবার খেতো এবং দাদির রান্না সে পাশে বসে গল্প করতো আর দেখতো।
এই গ্রামেরই মুসলমানের ছেলে মনিরুল। তার সাথে মিশতে মিশতে কখন যে ইন্দুবালা ও মনিরুল দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলে তা তারা কেউ বুঝতে পারে না। নদীর ধারে, দূর্গা ঠাকুরের চোখদানের সময়, বনে-বাদাড়ে, কুমড়ো চাষের জমিতে তারা হাঁটতো,দৌড়াতো। মনিরুল ইন্দুবালাকে নক্সী কাঁথার মাঠ পড়ে শোনাতো। সব স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। একটা সময় দেখা গেল তাদের গ্রামেরই দুজন হিন্দু মুসলমান ছেলে ও মেয়ের প্রেমের ফলে ছেলেটিকে মেরে ফেলা হয়, সেখান থেকেই ভয় ঢুকে যায় ইন্দুবালার মনে। ইন্দুর পরিবার থেকেও মানা করা হয় মনিরুলের সাথে মিশার ব্যাপারে। আস্তে আস্তে দূরত্ব বেড়ে যায় না চাইতেও।
একদিন দেখা যায় ইন্দুবালার বিয়ে হয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে। নিজের গ্রাম নিজের দেশকে ছেড়ে যেতে হয় ইন্দুবালাকে তার সাথে সাথে ছেড়ে যেতে হয় মা-বাবা, ছোটভাই,দাদি পরিবার পরিজন সাথে মনিরুলকেও। শ্বশুরবাড়িতে ঢুকার পরই তার বাবা এবং ছোটভাইকে সদর দরজার বাইরে থেকেই বিদায় দিতে হয় ইন্দুবালাকে। নতুন দেশ, নতুন জায়গা নতুন মানুষগুলোর মাঝে সে তার কলাপোতার ছোঁয়া পায় না।তার মন হাহাকার করতে থাকে। শ্বাশুড়ি যেরকম শাসনে রাখতেন তেমনি আবার ইন্দুবালার স্বামী ছিলো মদখোর ও তার বেশ্যাপাড়ায় অহরহ যাতায়াত ছিলো৷ স্বামীর পূর্বপুরুষদের বহু ধন-সম্পদ থাকলেও সব বিক্রি করতে করতে এখন তলা শূন্য। অভাবের সংসার ইন্দুবালার। ইন্দুবালার হাতের রান্নার ছিলো সুখ্যাতি। যেকোনকিছু দিয়ে রেঁধে ফেলতে পারতেন সুস্বাদু রান্না। দেশের মানুষের জন্য হাহাকার তার থামে না। একে একে খবর আসে ইন্দুবালার দাদি, মা,বাবা সকলেই গত হয়েছেন। এর মধ্যে ইন্দুবালা দুই ছেলের জননী হয়। শাশুড়ী গত হয় এবং সবশেষে দেনার ভার বাড়তেই থাকে। একদিন সন্ধ্যেবেলায় খবর আসে ইন্দুবালা মেয়েপাড়ায় অসুস্থ হয়ে গেছেন৷ তাকে বাড়িতে এনে রাখার কিছু সময় পরপরই মারা যায়। দুই সন্তানকে নিয়ে শুধু বাড়িটাকে অবলম্বন করে কোনরকমে দিন পার করতে থাকে৷ কিন্তু দেনাদার মানুষেরা বার বার টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে ইন্দুবালাকে৷ এসময় তাদের সাথে লড়ে মাছ বিক্রেতা লসমী। লসমী ইন্দুবালার বাড়িতে মাছ সরবরাহ করতো এছাড়াও আলাদা ভালোবাসায় জায়গা তৈরি হয় তাদের মাঝে। লসমীই একদিন ইন্দুবালাকে পয়সা দেয় তাকে যেনো দুপুরে খেতে দেয়৷ ইন্দুবালাও নিজের রান্নার জাদু দেখায়৷ রান্নার প্রশংসা তো করেই লসমী সাথে বলে পরদিন আরো দুজন মানুষ আসবে তাদেরকেও খাওয়াতে হবে। মূলত লসমী থেকেই শুরু হয় ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের যাত্রা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয় নি ইন্দুবালাকে৷ বিভিন্ন পেশার মানুষসহ ছাত্র-ছাত্রীরা খাওয়া শুরু করে ইন্দুবালার ভাতের হোটেলে।
আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে হোটেল। একদিন কচুভর্তা করবে বলে লসমীকে ভালো কচু আনতে বলে ইন্দুবালা। কচু নিয়ে আসার সময় ট্রেনে কাটা পরে লসমী। বহুদিন পর আপনজন হারানোর কষ্ট পায় ইন্দুবালা। এরপর দীর্ঘ দিন কেটে যায়। ইন্দুবালার সন্তানেরা যে যার মতো চলে যায়। বছরে বা মাসে দেখা করতে আসে তারা। এতোসব কিছুর পরও ইন্দুবালা তার ফেলে আসা কলাপোতা গ্রামকে ভুলতে পারে না। তার দেশের কথা বারবার স্মৃতিচারণ করে৷ হয়তো বা নাড়ির টানের কথা কেউ যেমন ভুলতে পারে না তেমনিই ইন্দুবালাও ভুলতে পারে নি। ভুলতে পারে নি মনিরুলের কথাটাও। দেশভাগের সময় তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। একদিন মনিরুল আসে তার হোটেলে তবে ইন্দুবালা না থাকায় দেখা হয় না তবে মনিরুল চিঠি দিয়ে যায়। ইন্দুবালা চিঠি পড়ে ভাবে মনিরুল হয়তো আগামীকাল আসবে৷ সে তার পছন্দের চন্দ্রপুলী পিঠাসহ নানা খাবার রান্না করে৷ কিন্তু সে আর আসে না গভীর রাতে দরজায় কড়া নাড়ে। দরজা খুলে জানতে পারে এক সাহসী যোদ্ধা। তাকে খাবারটা দিয়ে দেয়৷ এভাবে পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ইন্দুবালা।
এভাবেই চলতে থাকে। বহুদিন পর ইন্দুবালার সব ছেলেরা নাতি নাতনীসহ বেড়াতে এসে খুলনার কলাপোতা গ্রামে যাওয়ার প্রস্তাব করে। ইন্দুবালা রাজি হয়। ছোটছেলের উপর হোটেলের দায়িত্ব দিয়ে রেল স্টেশন পর্যন্ত গেলেও আর যেতে পারেনি ইন্দুবালা। ফিরে এসেছে নিজ দেশে অতিথি হয়ে যাওয়ার ভাবনাটা হয়তো থামিয়ে দিয়েছে তাকে।
লেখক কল্লোল লাহিড়ী পুরো বইটি আটটি পর্বে লিখেছেন। পর্বগুলোর নাম খুব চমৎকার খাবারের নাম দিয়ে। ‘বিউলির ডাল’, ‘কুমড়ো ফুলের বড়া’, ‘কচুবাটা’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পর্বগুলোর নামকরণের ফলে বইটা ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে একই সাথে বর্ণনা ও ভাষা কৌশলতার জন্য পাঠকের জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। গ্রামের সেই মুক্ত পাখির মতো হয়ে উড়া মেয়েটি খাঁচায় বন্দি হয়ে ছোট থেকে বড় হোটেলের বিস্তারের কাহিনি সহজ সরল সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। পুরো বইটি পড়ে পাঠকের মধ্যেও লোভ জাগবে ইন্দুবালার রান্না করা খাবারগুলো টেস্ট করার জন্য।
আরো ব্লগ পেতে এখানে ক্লিক করুন।
writer,
Mst.Luvna Akter
Intern, Content Writing Department, YSSE
