কথায় আছে, “শাড়িতেই সুন্দর নারী!”

বাঙালি নারীদের অন্যতম পছন্দের পোশাক এই শাড়ি! আবার তাও যদি হয় জামদানি শাড়ি তাহলে তো কথাই নেই। আমার মনে হয় এমন কোনো বাঙালি নারী খুঁজে পাওয়াটা যাবে না যারা জামদানি শাড়ি ভালোবাসে না!

নারীকুলের জামদানির প্রতি এ ভালোবাসা দেখে তাই বুঝি কবি লিখেছেন-

‘‘কত রং-বেরঙের শাড়ি দিলাম, নাম নাহি জানি!
হাটের পথে বন্ধু কয়, আইনো ঢাকাই জামদানি!’’

তবে শুধু বাঙালি নারী কেন, জামদানি শাড়ির সুনাম সারা বিশ্বেই। এই যে বিশ্বখ্যাত জামদানি, তা কিন্তু তৈরি হয় রাজধানী ঢাকার পাশেই অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে। দেশের একমাত্র জামদানি পল্লিটি রয়েছে এখানেই।

দেশের একমাত্র জামদানি পল্লি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জামদানি পল্লি। আগে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ করতেন কারিগররা। কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছিল না তাদের। তাই জামদানিশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সাহায্যে ১৯৯১ সালে নোয়াপাড়াতে তৈরি হয় জামদানি পল্লি। সেখানে তাঁতীপল্লির বাসিন্দার পাশাপাশি কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ফরিদপুর, নোয়াখালী, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাজ শিখতে আসেন বেকার যুবকরা।

জামদানি তৈরি শিখে নিজেদের এলাকায় অনেকেই গড়ে তুলেছেন নিজের তাঁতের কারখানা। অনেককেই নাম লিখিয়েছেন সেরা কারিগরের তালিকায়।

শুধু জামদানি পল্লিতে আটকে নেই কারখানা। নোয়াপাড়ার পাশের মৈকুলী, মগরাকল, কাহিনা, গন্ধবপুর, সোনারগাঁ, খিদিরপুর, ভারগাঁও, কাজীপাড়া, বড়গাঁও, আমগাঁও, ট্যাংগর, আন্ধারমানিক, দেওভোগ, নানাখি, নোয়াপুর, গঙ্গাপুরসহ আশপাশের আরও অনেক গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রায় এক দেড় হাজার তাঁতি।

যুগ যুগ ধরে ওই এলাকায় জামদানি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। জামদানি তৈরির জন্য রূপগঞ্জের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। কাপড়ে সুতা তোলা, সুতা রং করা আর শাড়ি বুনন ও নকশার কাজে সর্বদাই ব্যস্ত সময় কাটান জামদানি কারিগররা।

জামদানির নামকরণ আসলে কোথা থেকে হয়েছিল?

জামদানির নামকরণ নিয়ে নানা মত আছে। তবে “জামদানি” শব্দটি ফার্সি শব্দ থেকে এসেছে। ফার্সি “জাম” অর্থ কাপড় এবং “দানা” অর্থ বুটি, অর্থ্যাৎ জামদানি বলতে বুঝায় বুটিদার কাপড়

আমাদের কারও কারও এমনও মনে হতে পারে যে-ভালো মানের জামদানি শাড়ি কেবলমাত্র টাঙ্গাইলেই তৈরি হয় আর এর উদ্ভব বড় জোড় বৃটিশ আমলে। কিন্তু, নাঃ! জামদানি শাড়ির শিকড়টি আরও পুরনো-সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগেই প্রোথিত হয়েছিল। কেননা, জামদানি নকশার প্রচলন ও মসলিন কাপড়ের বিকাশ পাশাপাশিই শুরু হয়েছিল। নকশি কাঁথার মতোই আজ জামদানি শাড়ি বাংলার অনিবার্য সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠলেও-এটি ঠিক নকশি কাঁথার মতন একান্ত দেশিও নয়, বরং মুগল-পারসিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর নান্দনিক উত্তারাধিকার।

কিভাবে এত জনপ্রিয় হলো এই শাড়ি !

জামদানি ও মসলিনের প্রচলন প্রায় একই সময়ে শুরু। জামদানির নাম পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থ্য শাস্ত্রে, বিভিন্ন আরব, চীনা ও ইতালীয় পর্যটক ও ব্যবসায়ীর বর্ণনায়। কৌটিল্যের বইতে বঙ্গ ও পুণ্ড্র এলাকায় সূক্ষ্মতম বস্ত্রের উল্লেখ আছে। এগুলোর মধ্যে ক্ষৌম, দুকুল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসিকা। রপ্তানির সময় কার্পাসিকার নাম হয় মসলিন। মসলিন ছিল এক রঙের। আর তারমধ্যে কারুকাজ করা কাপড়কে বলা হতো জামদানি। মূলত ঢাকা জেলাতেই মসলিন চরম উৎকর্য লাভ করে। ঢাকার সোনারগাঁও, ধামরাই, রূপগঞ্জ মসলিনের জন্য বিখ্যাত ছিল।

মোগল আমলে জামদানির ব্যাপক প্রসার ঘটে। সম্রাট জাহাঙ্গীর জামদানির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৪শ শতকে লেখা প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে সোনারগাঁও এর বস্ত্র শিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে মসলিন ও জামদানির কথা বলেছেন। তবে জামদানি শাড়ির সব বিখ্যাত ও অবিস্মরণীয় নকশা ও বুননের অনেকগুলোই বর্তমানে বিলুপ্ত। এখন রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জে এই শিল্পের নিবাস।

বর্তমানে জামদানির অবস্থা

জামদানি বলতে এখন শাড়ি বোঝালেও সে সময়টায় অর্থাৎ মুসলিম আমলে জামদানি বলতে স্কার্ফ ও রুমালও বোঝাত। জামদানির ব্যবসা মুসলমানরাই করেছেন। দীর্ঘদিন-এবং একচেটিয়াভাবে।

বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁতিদের একত্রিভূত করণের জন্য ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্তৃক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে ২০ একর জমির উপর প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সর্বপ্রকার শিল্প অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ এক জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।

জামদানি এখন শুধু শাড়ীতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের কারুশিল্পীগণ তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও বাজার চাহিদার মাধ্যমে শাড়ী বুননের সাথে সাথে মেয়েদের টু পিছ (সালোয়ার কামিজ), ছেলেদের শার্টের কাপড়, ফতুয়া, পাঞ্জাবী, নেকটাই তৈরীসহ ও অন্যান্য বস্ত্র তৈরীতেও জামদানির নকশা ব্যবহার করছেন।

বর্হিবিশ্বে জামদানির কদর কেমন?

বর্তমানে দেশে এবং বর্হিবিশ্বের সম্ভ্রান্ত পরিবারবর্গ আসবাবপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘরের দরজা-জানালার পর্দা এবং ওয়াল মেট হিসাবে জামদানি কাপড় ব্যবহার করে থাকেন।

গবেষক ফোরবেস ওয়াটসন, ‘টেক্সটাইল মেনুফ্যাকচারাস্ অ্যান্ড কসটিউমস অভ দ্য পিপল অভ ইন্ডিয়া’, নামে একটি বই লিখেছিলেন। সে বইয়ে ওয়াটসন লিখেছেন,‘নকশাদার মসলিন, জটিল ছাপচিত্রের কারণে, ঢাকার বস্ত্রপন্যের মধ্যে সবচে দামী ছিল’। তখন ঢাকার জেলায় এমন কোনও গ্রাম ছিল না যে গ্রামে একটিও তাঁত ছিল না ।

এদিকে ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) সুরক্ষা আইন জামদানিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইউনেস্কো বাংলাদেশের জামদানি বয়নশিল্পকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই স্বীকৃতির ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বয়নশিল্পীদের সম্পৃক্ত করে জামদানি সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব। এমনকি জামদানির বয়ন ও বিপণন ব্যবস্থা–সম্পর্কিত জ্ঞান তাঁতিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াও যায়।

নকশি কাঁথার মতোই আজ জামদানি শাড়ি বাংলার অনিবার্য সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠলেও- এটি ঠিক নকশি কাঁথার মতন একান্ত দেশিও নয়, বরং মুগল-পারসিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর নান্দনিক উত্তারাধিকার।

এরকম আরো ব্লগ পড়তে, এখানে ক্লিক করুন

লেখক
মাফরুহা সুমাইয়া
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE