স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে তরুণেরা বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকতে-না-ঢুকতে, প্রশ্ন চলে আসে ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা নিয়ে। চাকরি না ব্যবসা? চাকরি করলে সরকারি না প্রাইভেট? নাকি আরো কিছু বছর পড়াশুনা কন্টিনিউ করবে? এগুলো হলো প্রচলিত চিন্তাভাবনা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ব্যবসার চেয়ে চাকরি করা টাই বেশী গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। এরই মধ্যে বিসিএস যেন সবার মধ্যমণি। আবার কেউ বা অনার্স সম্পন্ন করার পর চাকরিতে না ঢুকে বিদেশ চলে যায় উচ্চশিক্ষার জন্য।
যদিও এ সকল বিষয়বস্তু ব্যক্তির ইচ্ছা ও লক্ষ্যের উপর তা নির্ভর করে তারপরও কিছু ফ্যাক্টর; যা মাথায় রাখতে হবে। প্রথমে আসা যাক বিসিএস-এর কথায়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা হলো সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রধান উপায়। এ পরীক্ষা যেন সবার চোখের মণি। বিসিএস পরীক্ষা উত্তীর্ণ হলে নানা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। বিসিএস-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দেশে স্থায়ী একটি ক্যারিয়ার নিশ্চিত হওয়া, যেটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করে। এছাড়া, সরকারি চাকরির স্থায়িত্ব এবং পেনশন সুবিধা; এটিকে অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
অনার্সের তৃতীয় বা চতুর্থ বছর থেকে বিসিএস এর প্রস্তুতি শুরু করে দেয় অনেকেই। ঢাকার নীলক্ষেতের মতো যত বইয়ের দোকান রয়েছে সবগুলোতে যেন বিসিএস এর বই কেনার ধুম লেগেই থাকে। প্রতি বছর দেখা যাচ্ছে, গড়ে প্রায় ৩.৮ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভিড়ে প্রিলিমিনারিতে পাস করছে মাত্র ১৬,৯৭৯ জন। এর মধ্যে ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পান শেষে মাত্র ৩,৫০০–৪,০০০ জন প্রার্থী। এত জনসমুদ্রে কার চান্স মিলবে বলা মুশকিল। বিসিএস পরীক্ষার প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সহজ কথা নয়। খুবই কম পরীক্ষার্থী আছে যারা প্রথম চেষ্টাতেই বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে পেরেছে।
তবে, বিসিএস আরো কিছু খারাপ প্রভাবও রয়েছে বটে। বিসিএস পরীক্ষার প্যাটার্ন ফলো করায় ছাত্রছাত্রীরা তাদের নিজস্ব বিষয় নিয়ে আগ্রহ ও সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিষয়টি আরও হতাশাজনক। তারা যেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন, ও নতুন জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করতে পারত, সেখানে বিসিএস সিলেবাস মুখস্থ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান নিয়ে ক্যারিয়ার গড়া, নতুন আবিষ্কার করা বা নিজ নিজ বিষয়ের গভীরতায় যাওয়ার পরিবর্তে: দিনভর সময় ব্যয় করছে বাংলা ব্যাকরণ বা সাধারণ জ্ঞানের মতো বিষয়গুলো পড়ার পেছনে। অবশ্যই, সবার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।
অন্যদিকে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা অনেক শিক্ষার্থীদের জন্য যেন আশার আলো। বিদেশের উচ্চজীবনযাত্রা, পড়াশুনার উচ্চমান, পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ ইত্যাদি কারনে এটি অনেকের কাছে আকর্ষণীয়। পাশাপাশি যারা কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চান এবং গবেষণায় আগ্রহী হন, তাহলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা একটি ভালো সুযোগ। বিদেশে পড়াশোনা বিশ্বমানের শিক্ষা, অত্যাধুনিক গবেষণা সুবিধা, এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। এছাড়া, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে বা বিদেশে ভালো চাকরির সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
তবে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যে খরচ এবং সাংস্কৃতিক মানিয়ে চলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। বহু দেশে ইংরেজি ভাষাতে কাজ হয় না, সাথে ঐদেশের নির্দিষ্ট ভাষা আয়ত্ত্বে থাকা লাগে। যেমন জার্মানি, জাপান, স্পেন সহ বেশ কিছু দেশে। পরিবারের থেকে দূরে থাকা, একটি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, এবং আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক স্বচ্ছলতা বিদেশে পড়ার জন্যে অন্যতম একটি বাধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বৃত্তি এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে; তবে এসকল বৃত্তির পাওয়ারও সৌভাগ্য সকলের হয় না। দেশীয় প্রেক্ষাপটে শিক্ষাঋণ পাওয়াও তুলনামূলক দুষ্কর।
ক্যারিয়ার গঠনের জন্য উভয় ব্যবস্থা অতি প্রতিযোগিতামূলক। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, এবং তাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই সফলতা লাভ করে। অন্যদিকে বাহিরে পড়তে যাওয়ার জন্যে প্রয়োজন টাকা, ভালো গ্রেড। আবার রয়েছে স্কলারশিপের অপর্যাপ্ততা।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এই চ্যালেঞ্জগুলি বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উভয় পথেই সফল হতে হলে প্রয়োজন একাগ্রতা, ধৈর্য, এবং কঠোর পরিশ্রম। দেশেই হোক বা বিদেশে, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ, লক্ষ্য, এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে আপনার ভবিষ্যতের জন্য সর্বোত্তম পথ।
এরকম আরও ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন
লেখক,
মোঃ মাশরাফি আলম নাফি
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
