বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ভাষাগুলোর একটি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অনুভূতির বাহন হিসেবে কাজ করে এসেছে। তবে প্রযুক্তির জগতে বাংলা ভাষার প্রবেশ ছিল অনেকটাই ধীরগতির। ইংরেজি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাভাষীদের মাঝে এক ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বাধা ভেঙে বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত অভিযাত্রার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছিল “অভ্র“।
২০০৩ সালে মেহেদী হাসান নামক এক তরুণ প্রতিভা তৈরি করেন “অভ্র কিবোর্ড“। এটি একটি ওপেন সোর্স বাংলা ইনপুট সফটওয়্যার, যা ইউনিকোড ভিত্তিক এবং ইংরেজি অক্ষরের মাধ্যমে বাংলা লেখার সুবিধা দেয়। সহজভাবে বললে, অভ্র কিবোর্ড ব্যবহার করে ‘ami bhalo achi’ লিখলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘আমি ভালো আছি’ হয়ে যায়। অভ্র’র এই ধরণের ফনেটিক ইঞ্জিন বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির জগতে নতুন প্রাণ এনে দেয়।
অভ্র’র আগমন পূর্বে যারা বাংলা টাইপ করতেন, তাদের বিজয় কিবোর্ড বা অন্যান্য কমপ্লেক্স লেআউট ব্যবহার করতে হতো যা ছিল কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। অভ্র ফনেটিক পদ্ধতি এই জটিলতা দূর করে দিল। একজন সাধারণ ব্যবহারকারী যিনি কেবল ইংরেজি টাইপ করতে জানেন সহজেই তিনিও বাংলা লিখতে পারছেন। সহজলভ্যতা বাংলা ভাষায় ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল, একাডেমিক লেখা এবং এমনকি পেশাগত কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে ।
একটি ভাষা তখনই টিকে থাকে যখন তা দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত থাকে। অভ্র ঠিক সেটাই করেছে। এর কল্যাণে আমরা ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে, মেসেঞ্জারে অথবা গুগলে খোঁজাখুঁজি করতেও বাংলা ব্যবহার করছি। আমাদের ভাষা এখন শুধু বইয়ের পাতা বা কবিতার খাতা নয়, প্রযুক্তির স্ক্রিনেও জ্বলজ্বল করছে।
অভ্র ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের প্রবন্ধ, রিপোর্ট, অ্যাসাইনমেন্ট সহজেই বাংলায় প্রস্তুত করতে পারছে। শিক্ষকরা বাংলা ভাষায় উপস্থাপনা তৈরি করছেন, এবং গবেষকরা ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলা ব্যবহার করে অনলাইনে গবেষণা প্রকাশ করছেন। এক সময় বাংলায় তথ্য প্রযুক্তির অপ্রতুলতা যে একটি প্রধান বাধা ছিল, অভ্র সেটিকে অনেকখানি দূর করেছে।
অভ্র কেবল একটি সফটওয়্যার নয়, এটি একটি দর্শন। ওপেন সোর্স হিসেবে অভ্র সবার জন্য উন্মুক্ত এবং বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। কেউ চাইলে অভ্রের কোড ডাউনলোড করে নিজের মতো করে পরিবর্তন করতে পারে, এতে বাংলা ভাষা প্রযুক্তিতে আরও বেশি উদ্ভাবনের পথ খুলে যায়।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাভাষীদের জন্য অভ্র একটি আশীর্বাদ স্বরূপ। আগে বাংলা লেখার জন্য সফটওয়্যার কিনতে হতো কিংবা ভিন্নধর্মী ইনপুট পদ্ধতি ব্যবহার করতে হতো। এখন শুধুমাত্র অভ্র ইনস্টল করলেই যেকোনো জায়গা থেকে মাতৃভাষায় লেখা সম্ভব। এতে করে বাংলা ভাষা পরিবার-পরিজনের সংযোগের বাহন হিসেবে কার্যকরভাবে কাজ করছে।
আজ আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষা মডেল এবং ভয়েস রেকগনিশনের কথা বলি, তখন বাংলা ভাষাকেও সেই জগতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি। অভ্রের মত প্রযুক্তি সেই রাস্তাকে সুগম করছে। ইতিমধ্যেই অনেক অ্যাপ্লিকেশনে বাংলা ভাষার সাপোর্ট এসেছে, বাংলা টেক্সট-টু-স্পিচ ও ভয়েস ইনপুটের কাজ এগোচ্ছে। অভ্র সেই পথের অন্যতম পুরোধা।
অভ্র কেবল একটি প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলা ভাষার প্রতি এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিফলন। মেহেদী হাসান এবং অভ্র টিম যে অবদান রেখেছেন, তা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অভ্র আমাদের শিখিয়েছে যে ভাষার টিকে থাকা নির্ভর করে কেবল সাহিত্য বা কবিতায় নয়, বরং প্রযুক্তিতে তার প্রয়োগ ও সহজলভ্যতার উপর।
আজ বাংলা ভাষা অভ্রের হাত ধরে ডিজিটাল দুনিয়ায় এক নতুন পরিচয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করছে। ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস থেকে শুরু করে প্রযুক্তির জয়যাত্রা। একদিন আমাদের বাংলা ভাষার জন্য অনেকে প্রাণ দিয়েছিল। আজ আমাদের এই ভাষা প্রযুক্তির অঙ্গনে তার গৌরবময় উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছে। এ যেন ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের এক নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি। অভ্র প্রযুক্তি আর ভাষার মিলনে এক নীরব বিপ্লবী।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক
মোছা:জান্নাতুল ফেরদৌসী রিচি
ইন্টার্ন,কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
