অতীতের সোনালী মুহূর্তগুলোতে কোনটা বেশি ভয়ংকর ছিল, মধ্যরাতের ঝড় নাকি বাংলা সিনেমার ভিলেনদের সেই বীভৎস হাসি? যেই হাসি শুনলে পর্দার সামনে বসে থাকা দর্শকদের গা ছমছম করে উঠত। এই ভিলেনরাই ছিলেন বাংলা সিনেমার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে ক্লাসিক যুগের ভিলেনদের চোখ রাঙানো চাহনি, খলখল হাসি আর কুটকৌশল সবকিছু মিলেমিশে তৈরি হতো এক জমজমাট চিত্রনাট্য।
ক্লাসিক যুগের ভিলেনদের সেই দাপুটে অভিনয় যেন পর্দা জুড়ে দর্শকদের মনে শিহরণ জাগাতো। যেমন, রাজকুমারের সেই ভয়ংকর হাসি কিংবা এটিএম শামসুজ্জামানের চোখ রাঙানো চাহনি আজও দর্শকদের মনে দাগ কাটে। আবার ধরুন, হালের বাংলা সিনেমায় মিশা সওদাগর বা আহমদ শরীফের মতো অভিনেতারা ভিলেন চরিত্রে এনেছেন নতুনত্বের ছোঁয়া। তাদের অভিনয় শৈলী যেমন ভিলেন চরিত্রগুলোকে নিয়ে গিয়েছে এক অন্যরকম উচ্চতায়, তেমনি দর্শকদের মনে তৈরি করেছে ভালো-লাগার অনুভূতি। খলনায়কদের সেই বিদঘুটে হাসি, চোখ রাঙানো চাহনি আর কুটকৌশল যেন দর্শকদের মনে ভয় ধরিয়ে দিত। এই ভিলেনরাই ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক, যাদের দাপটে সিনেমার পর্দা কাঁপতো।
পক্ষান্তরে, আধুনিক যুগের ভিলেনরাও একেবারেই কোন দিক থেকে পিছিয়ে নেই। তাদের স্টাইলিং, সুচিন্তিত মেকআপ, পোশাক-পরিচ্ছদের নিখুঁত নির্বাচন, এবং স্বতন্ত্র কেশসজ্জা খলনায়ক চরিত্রগুলোকে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। এই নান্দনিক পরিবর্তনগুলো আধুনিক ভিলেনদেরকে দর্শকদের মনে আলাদা একটি জায়গা তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে।
আধুনিক বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মধ্যে এক অন্যরকম স্মার্টনেস লক্ষ্য করা যায়। তাদের সবকাজেই একটা আধুনিকতার ছোঁয়া পরিলক্ষিত হয়। এই ভিলেনরা কেবলমাত্র পেশাদার অপরাধীর চরিত্রটিকেই নয় বরং বছরের পর বছর তাদের অভিনয়শিল্পের মধ্যে দিয়ে অন্যরকম এক ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন ধরুন, মিশা সওদাগর, মনোয়ার হোসেন ডিপজল, আহমেদ শরীফের মত অভিনয়শিল্পীরা তাদের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলোকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছেন। কালের বিবর্তনে ভিলেনদের মাঝে অভিনয়শৈলীর পরিবর্তনগুলো দর্শকদের মনে কৌতূহল এবং ভয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
ক্লাসিক এবং আধুনিক যুগের ভিলেনদের মধ্যে কিছু স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ক্লাসিক যুগের রাজকুমার আর এটিএম শামসুজ্জামানদের মত ভিলেনরা ছিলেন অনেকটা নাটকীয়, তাদের মধ্যে একটা অতিরঞ্জিত ভাব দেখা যেত। কিন্তু আধুনিক কালের আহমেদ শরীফ আর মিশা সওদাগরদের মতো ভিলেনরা অনেকটাই বাস্তবসম্মত। তাদের অভিনয়শৈলীতে ব্যক্তিত্ব এবং স্মার্টনেসের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। সময়ের পালাক্রমে, ভিলেন চরিত্রের এই পরিবর্তনগুলো বাংলা সিনেমার গল্পের ধরনকেও বদলে দিয়েছে। ভিলেনদের এই শক্তিশালী উপস্থিতি সিনেমার গল্পকে আরোও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এবং দর্শকদের মনে একটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
চলুন এবার একটু দেখা যাক, ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমার ভিলেনদের প্রভাব কতটুকু থাকতে পারে? বর্তমান যুগকে বলা হয় জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমায় প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়বে ঠিক তেমনি অপরাধের পরিকল্পনা এবং সেটির বাস্তবায়নেও নতুন এক মাত্রা যোগ হবে। পাশাপাশি সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিলেনদের চরিত্রকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো বাংলা সিনেমার গল্প বলার ধরনে যেমন নতুনত্ব আনবে, ঠিক তেমনি দর্শকদেরকে আকর্ষণীয় কিছু দিতে পারবে।
বাংলা সিনেমার ভিলেনরা যেন এক জীবন্ত চরিত্র, যারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদেরকে বদলেছে। ক্লাসিক যুগের সেই ভয়ংকর ভিলেন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের স্মার্ট ভিলেন, যে ধারাবাহিক বিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটি বাংলা সিনেমার গল্প বলার ধরনকে বদলে দিয়েছে। ভিলেনদের এই বিবর্তন শুধুমাত্র যে সিনেমার জগতেই প্রভাব ফেলেছে তাই নয় বরং দর্শকদের মনেও গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
পরিশেষে এতোটুকুই বলা যায় যে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ভিলেনদের এই বিবর্তন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা যা দর্শকদের স্মৃতির পাতায় যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে।
এই ধরনের আরও ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক,
মো:কাইয়ুম
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
