দরজায় ঠকঠক আওয়াজে চমকে উঠলো সুজানা। “এখন আবার কে এল? মা এসে আবার জোর করবে না তো?” ইতস্তত করে দরজা খুললো সে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মলি, সুজানার বাল্যকালের বন্ধু। “তিনমাস হয়ে এলো দোস্ত, তুই কি একবারও বের হয়েছিস এর মধ্যে?” সুজানার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় মলি। “তোরা বুঝিস না কেন? আমি ভয় পাই!” ডুকরে কেঁদে ওঠে সুজানা।
সুজানার এ ছোট ঘটনাটা আপনার মনে নাড়া দিয়েছে অবশ্যই। বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে, এ কেমন কথা? সুজানা চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও এ ঘটনাটি কাল্পনিক নয়। ঘর থেকে বের হওয়ার অথবা দূরে একা যাওয়ার এ অস্বাভাবিক ভীতিই হচ্ছে এগোরাফোবিয়া।
কী এই এগোরাফোবিয়া?
এগোরাফোবিয়া হল এক ধরনের উদ্বেগজনিত ব্যাধি বা anxiety disorder. এগারোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এমন পরিবেশ ছেড়ে যেতে ভয় পান, যাকে তারা নিরাপদ বলে মনে করেন। সাধারণত নিজের বাড়িকেই তারা নিরাপদ পরিবেশ বলে ভেবে থাকেন। তারা দিনের পর দিন, এমনকি বছর ধরেও বাইরে যাওয়া বা একা দূরে যাওয়া এড়িয়ে থাকেন। এগোরাফোবিয়াকে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘বাজার বা মার্কেটপ্লেসের ভয়।’ অর্থাৎ, ব্যস্ত যেসকল জনবহুল স্থান রয়েছে যেমন ট্রেন, বাস, ট্রাম, শপিংমল, সুপারমার্কেট ইত্যাদি, এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এসকল স্থান এড়িয়ে চলেন।
এগোরাফোবিয়ার লক্ষণ:
- নিরাপদ পরিবেশ থেকে দূরে থাকার ফলে উদ্বেগ অনুভব করা।
- নিরাপদ পরিবেশ থেকে দূরে গেলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, চরম ভয়ের উদ্রেক হওয়া।
- আত্নসম্মান এবং আত্নবিশ্বাসের ঘাটতি।
- বাড়ি বা পরিচিত পরিবেশের বাইরে দূরে যাওয়ার অনীহা।
- ডিপ্রেশন, যা এগোরাফোবিয়া থেকে উদ্ভূত হতে পারে।
এগোরাফোবিয়ার ক্ষতি:
- এগোরাফোবিয়া ব্যক্তির জীবনযাত্রায় আনতে পারে বিঘ্ন। এগোরাফোবিয়ার ক্ষতিগুলো দেখে নেওয়া যাক:
- একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বাড়ির বাইরে যে কাজগুলো করে থাকেন যেমন চাকরি, ঘোরাফেরা, সামাজিকতা, পড়াশোনা ইত্যাদি, এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি এগুলো থেকে বঞ্চিত হন।
- আর্থিক দুরাবস্থা আর একাকিত্ব ব্যক্তিকে হতাশা এবং ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়।
- এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার ফলে অসহায়ত্বে ভুগে থাকেন।
- এরকম ব্যক্তি হতাশা ভোলার জন্য অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস যেমন মাদকাসক্তি, comfort eating ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকেন।
এগোরাফোবিয়া কীভাবে বাসা বাঁধে?
এগোরাফোবিয়া সাধারণত ছোটখাটো ঘটনা থেকে শুরু হয়। সেটা এমন কোন ঘটনা, যেটা একজন ব্যক্তিকে মানসিকভাবে আহত করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চাকরি বা প্রিয় মানুষকে হারানো। মানসিকভাবে আঘাত পাবার ফলে একজন ব্যক্তি নিজেকে তার চারপাশের পরিবেশ থেকে গুটিয়ে ফেলেন। সময়ের সাথে সাথে বাইরের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে বাইরে বের হতে ব্যক্তি অস্বস্তি বোধ করে থাকেন। এভাবেই এক সময় ব্যক্তি এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত হন।
এগোরাফোবিয়া কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
একজন ব্যক্তি এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত কীনা সেটা সাধারণত তার লক্ষণগুলো থেকে বিচার করা হয়। কিন্তু তার আগে চিকিৎসক যথাযথ মেডিকেল পরীক্ষানিরীক্ষা করে থাকেন এটা নির্ণয় করার জন্য যে লক্ষণগুলো এগোরাফোবিয়ার নাকি অন্য কোন অন্তর্নিহিত ব্যাধির। এক্ষেত্রে আরো সূক্ষ্মভাবে এগোরাফোবিয়া নির্ণয়ের জন্য একজন সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া বাঞ্চনীয়।
নিজে কীভাবে এগোরাফোবিয়া মোকাবিলা করা যায় :
এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়াও নিজে উদ্যোগ নিতে পারেন তার ভীতিকে মোকাবিলা করার জন্য।
- এগোরাফোবিয়া মোকাবিলা করার প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের ভীতির মাত্রা বা অবস্থাকে চেনা। আপনার ভয় কীভাবে আপনার শরীর ও মনের উপর প্রভাব ফেলছে সেটা খুঁজে বের করা।
- ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন রিলেক্সেশন মেথড ব্যবহার করা যায়। মেডিটেশন, ব্যায়াম মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
- অস্থিরতা বাড়ায় এরকম কোন খাবার বা পানীয় এড়িয়ে চলা এক্ষেত্রে জরুরি। ক্যাফেইন সমৃদ্ধ পানীয় যেমন কফি, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার, সিগারেট এবং মদ এড়িয়ে চলতে হবে।
- এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্যানিক এটাকের শিকার হলে হাইপারভেন্টিলেশন ( দ্রুতগতিতে শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়া) হওয়ার প্রবণতা থাকে। এক্ষেত্রে নিজের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে ধীরেধীরে শ্বাস নিলে এবং ছাড়লে ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
- এগোরাফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি আস্তেধীরে তার মনে ভীতি সৃষ্টিকারী পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, কাছের কোন মানুষের সাথে অল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার মাধ্যমে। এভাবে নিয়মিত নিজের ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে বাইরে গেলে আক্রান্ত ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারবেন যে তাকে ক্ষতি করার মত বাইরে কেউ নেই।
সর্বশেষে এটাই বলা যায় যে, এগোরাফোবিয়া যতই একজন ব্যক্তিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করুক না কেন, মনোবল এবং সুচিকিৎসার দ্বারা অন্য সব ভয়ের মত একেও করা যায় জয়!
এরকম আরো ব্লগ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক :
তাসরিবা তাজরিন
ইনটার্ন
কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
