বিদেশে উচ্চশিক্ষা- এই শব্দগুচ্ছ অনেক তরুণের কাছে স্বপ্নের মতো শোনায়। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সাহস, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাস। ঠিক তেমনই এক যাত্রার গল্প কাজী নুর উদ্দীন রনির, যিনি আজ যুক্তরাষ্ট্রের Kent State University, Ohio তে Applied Mathematics বিষয়ে পিএইচডি করছেন।

শৈশব থেকে শুরু এক জ্ঞানভিত্তিক পথচলা

ফেনীতে জন্ম, আর বেড়ে ওঠা পার্বত্য খাগড়াছড়িতে। ছোটবেলা থেকেই যুক্তি ও সংখ্যার জগতে আগ্রহ ছিল রনির। এসএসসি সম্পন্ন করেছেন রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে, আর এইচএসসি কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে। এরপর গণিতে বিএসসি ও এমএসসি করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

Management Information Systems (MIS) এ এমবিএ। জ্ঞানের এই ধারাবাহিকতা আজ তাকে নিয়ে গেছে গবেষণার নতুন দিগন্তে যুক্তরাষ্ট্রে।

উচ্চশিক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বেছে নেওয়ার কারণ

রনির ভাষায়, “Advanced Cutting Edge Technologies এর জন্য আমেরিকা সেরা। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই এখানে, আর তাদের গবেষণার সুযোগও অনেক বেশি।”

তিনি বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি কোর্সওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। আরেকটি বড় কারণ তার পরিবার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে।

অনুপ্রেরণার মূল উৎস: বাবার স্বপ্ন

রনি জানান, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার বাবা।

“আমার মা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই, কিন্তু বাবা চাইতেন আমি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করি। বাবার মৃত্যুর পর তার স্বপ্নই আমার প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।”

এছাড়া তার মামাও তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যিনি আমেরিকা থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন।

চ্যালেঞ্জের মুখে ধৈর্য ও অভিযোজন

নতুন দেশে গিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা প্রথমে তাকে ভোগায়। “আমরা যেহেতু নেটিভ স্পিকার না, তাই ভাষার চ্যালেঞ্জ ছিল,” তিনি জানান। তবে বাংলাদেশি কমিউনিটির সহায়তা ও মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছাশক্তিই তাকে টিকিয়ে রেখেছে। “এখানে সবাই একে অপরকে সাহায্য করে, বাজার থেকে শুরু করে নামাজ, সব জায়গায় একধরনের পারিবারিক বন্ধন গড়ে ওঠে।”

তরুণদের বিদেশমুখী প্রবণতা নিয়ে মত

রনির মতে, আজকের প্রজন্মের বিদেশে পড়াশোনার আগ্রহ বেড়েছে কারণ তথ্যের সহজলভ্যতা। আগে স্কলারশিপ, বিশ্ববিদ্যালয় বা রিসার্চ সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল, এখন তা হাতের মুঠোয়।

তবে তিনি মনে করেন, “বিদেশে যাওয়া সবার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত- এমন নয়। এটা পুরোপুরি নির্ভর করে ব্যক্তির লক্ষ্য, প্রস্তুতি ও পরিস্থিতির ওপর।”

স্কলারশিপ ও প্রস্তুতির বাস্তব দিক

রনি জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ অনেক, বিশেষত যারা Teaching Assistantship (TA) এবং Research Assistantship (RA) পেতে আবেদন করে।

তিনি বলেন,

“সিজিপিএ, গবেষণায় সম্পৃক্ততা, পাবলিকেশন এসবই গুরুত্বপূর্ণ। STEM ফিল্ডের শিক্ষার্থীদের Python, R বা MATLAB শেখা উচিত। এগুলো রিসার্চে বড় সুবিধা দেয়।”

তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে বড় বাধা আর্থিক নয়। আবেদন ফি, টেস্ট ফি, ভিসা ফি—সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকায় প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব।

সফলতার পথে পরিশ্রম ও পরিকল্পনা

রনি বিশ্বাস করেন, ভালো প্রোফাইল গঠনের শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই। ‘ভালো CGPA রাখা, ক্লাব ও রিসার্চ গ্রুপে যুক্ত হওয়া, প্রফেসরদের কাজ বিশ্লেষণ করা- এসবই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে।”

তাঁর মতে, SOP বা রিসার্চ প্রোপোজাল তৈরিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। “সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপে টেমপ্লেট পাওয়া যায়, সেগুলো দেখে নিজের মতো করে তৈরি করতে হবে।”

পরিবারের অবদান ও মানসিক শক্তি

রনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেন, “আমার মা অসীম পরিশ্রম করেছেন, বোনেরা পাশে থেকেছে, আর আমার স্ত্রী তার ত্যাগের কথা বলেই শেষ করা যাবে না।” এছাড়া উনার মামারা অনেকভাবে সাপোর্ট করেছেন। পরিবারের এই নিরব সমর্থনই তাকে প্রতিদিন নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বার্তা

পিএইচডি শেষে রনি পোস্টডক্টরাল গবেষণা করে একাডেমিয়ায় ক্যারিয়ার গড়তে চান। তার লক্ষ্য স্পষ্ট- “গবেষণার মাধ্যমে সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করা।”

তরুণদের উদ্দেশে তাঁর শেষ বার্তা-

“হতাশ হয়ো না। মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করো, পরিশ্রম করো। রিজিকের মালিক আল্লাহ্। একসময় ফল অবশ্যই আসবে।”

কাজী নুর উদ্দীন রনির গল্প শুধু বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের নয়- এটি অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ নয়- প্রস্তুতিই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আর জ্ঞান অর্জনের এই যাত্রা, শেষ পর্যন্ত মানবতার সেবায় রূপ নেয় যেখানে প্রতিটি সমীকরণের ভেতর লুকিয়ে থাকে এক টুকরো আশার গল্প।

এই রকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন। 

লেখক

আজিজুল হাকিম রাকিব

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE