লেখালেখি অনেকের কাছেই কেবল শব্দের খেলা, কিন্তু নাফিউ সাজিদ জয়ের কাছে এটি দায়িত্ব নিজেকে জানার, সমাজকে বোঝার এবং মানুষের চিন্তা পরিবর্তনের এক সৃজনশীল উপায়। ঢাকার এই তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। স্কুলজীবন কাটিয়েছেন সিভিল এভিয়েশন হাই স্কুল এন্ড কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা এবং বিএএফ শাহীন কলেজ, তেজগাঁও, ঢাকা, থেকে কলেজ জীবন শেষ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি একাডেমিয়ায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন।
লেখালেখির শুরু: হাস্যরস থেকে সামাজিক বাস্তবতায়
নাফিউর লেখালেখির শুরুটা একদমই পরিকল্পিত ছিল না। শুরু করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় হাস্যরসাত্মক পোস্ট দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু একসময় ফেসবুক থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল লিংকডইন ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর কলাম লেখার পথচলা।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে New Age পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম লেখা। এরপর থেকে Daily Sun, The Daily Star, The Business Standard, Dhaka Tribune, Daily Observer সহ জনকণ্ঠ, কালের কণ্ঠ, ইনকিলাব এর মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে নিয়মিত লিখছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে পাকিস্তানের পত্রিকা The Pakistan Today এর মত জনপ্রিয় পত্রিকাতেও লিখেছেন।
পরিবেশ, সামাজিক সমস্যা, লিঙ্গসমতা ও উন্নয়ন এই বিষয়গুলোতেই তিনি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। তাঁর লেখায় সমাজের বাস্তবতা যেমন ধরা পড়ে, তেমনি ফুটে ওঠে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও।
প্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গি
লেখালেখির পেছনে বিশেষ কোনো ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা না থাকলেও নিজের পড়াশোনার বিষয় সম্পর্কে মানুষের কম সচেতনতা তাঁকে কলম ধরতে উৎসাহ দিয়েছে। তাঁর মতে, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা আছে, তাই লেখার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান এই ডিসিপ্লিন কীভাবে জ্ঞান, গবেষণা ও সমাজচিন্তার সঙ্গে যুক্ত।
কলাম লেখার পথ ও প্রতিবন্ধকতা
লেখালেখির শুরুটা সহজ ছিল না। কয়েক বছর আগে লেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রকাশের প্রক্রিয়া না জানায় এবং লেখা প্রকাশ না হওয়াতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারপর তিনি ধৈর্য নিয়ে এগিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস
“জ্ঞান যত বাড়ে, আগ্রহও তত বাড়ে। প্রকাশ না পেলেও লেখা চালিয়ে যেতে হয়, কারণ সুযোগ একদিন আসবেই।”
তরুণদের কলামবিমুখতা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ
নাফিউ সাজিদ জয় মনে করেন, এখনো অনেক তরুণ কলাম লিখতে চায়, কিন্তু জানে না কোথা থেকে শুরু করবে। “অনেকে জানে না কিভাবে লেখা পাঠাতে হয়, কাকে পাঠাতে হয়, এ কারণেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে,” তিনি বলেন। এই সমস্যা দূর করতে তিনি নিজেই একটি ম্যাগাজিন চালু করেছেন, যেখানে তরুণ লেখকদের লেখা প্রকাশ পাচ্ছে। তাঁর মতে, “সেমিনার, নলেজ শেয়ারিং সেশন বা মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম করলে তরুণদের আগ্রহ বাড়বে।”
কলাম লেখার বিষয় নির্বাচন
জয়ের মতে, বিষয় বেছে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো বেশি বেশি পড়া। “কলাম পড়তে থাকলে নিজের আগ্রহ তৈরি হয়। কারো ফিচার ভালো লাগে, কারো বিশ্লেষণধর্মী লেখা এভাবেই নিজের পছন্দ তৈরি হয়,” তিনি বলেন।
লেখার মান বাড়ানোর পরামর্শ
তাঁর মতে, ভালো লেখার মূল চাবিকাঠি হলো পড়ার অভ্যাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই যারা লেখালেখিতে আগ্রহী, তাদের উচিত নিয়মিত কলাম ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়া। এতে চিন্তার পরিসর বাড়ে, ভাষা পরিণত হয়, আর শব্দে প্রকাশ পায় আত্মবিশ্বাস।
সাফল্য ও পরিবারের ভূমিকা
জয় নিজেকে এখনো ‘সফল’ মনে করেন না, তবে পরিবারের সমর্থন তাঁকে নিরন্তর প্রেরণা দেয়। বাবা-মা তাঁর লেখা প্রকাশ হলে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন, খালা, খালু এবং আত্মীয় স্বজনরা তাঁর লেখা পড়েন, আর প্রথমবার Daily Star এ লেখা ছাপা হলে দুলাভাই খুশি হয়ে উপহার পাঠান, এই ভালোবাসাই তাঁকে সামনে এগোতে শক্তি দেয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও তরুণদের জন্য বার্তা
ভবিষ্যতে তিনি একাডেমিক জগতে যুক্ত থাকতে চান এবং গবেষণা, শিক্ষা ও সমাজচিন্তার মাধ্যমে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে চান। তাঁর ভাষায়, “লেখালেখি আমার কাছে শখের বিষয় তবে এটি চিন্তার এক একাডেমিক রূপ।” তরুণদের জন্য তাঁর বার্তা সহজ কিন্তু শক্তিশালী,
“কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই লিখতে থাকো। আর্থিক লাভ না হলেও দেশের জন্য কিছু করতে পারছো এই তৃপ্তিটাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”
নাফিউ সাজিদ জয়ের গল্প এক তরুণের বাস্তব যাত্রা যেখানে লেখালেখি শুধু প্রকাশ নয়, চিন্তা, অধ্যবসায় ও আত্মপ্রত্যয়ের প্রতিফলন। তিনি দেখিয়েছেন, দায়িত্ববোধ থেকে চালিত একটি কলমই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
YSSE – এর পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা তাঁর চিন্তার গভীরতা, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ প্রজন্মের জন্য হবে অবিস্মরণীয় অনুপ্রেরণা।
এই রকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক
আতিয়া ইবনাত রিফাহ্
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
