বর্তমান সময়ে কলমের শক্তিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। চিন্তা, বিশ্লেষণ ও যুক্তির মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো। এমন এক সময়, যখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার যুগে গভীর বিশ্লেষণের জায়গা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে, তখনও কিছু মানুষ তাঁদের লেখার মধ্য দিয়ে সমাজকে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং শিখতে শেখাচ্ছেন। তেমনি একজন সাহসী ও অনুপ্রেরণাদায়ী লেখক এম এ হোসাইন যিনি একাধারে সাংবাদিক, কলামিস্ট ও চিন্তাশীল সমাজকণ্ঠ, যিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও রেখেছেন দৃঢ় অবস্থান।
বেড়ে ওঠা ও জীবনের পথচলা
ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার সন্তান এম এ হোসাইন শৈশব কাটিয়েছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিবেশে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর আত্ম-অনুসন্ধানের যাত্রা। বর্তমানে তিনি সাংবাদিকতা ও ব্যবসা উভয় ক্ষেত্রেই যুক্ত। তিনি ‘The News Analytics Herald’ (India) এর জন্য দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল কভার করেন। পাশাপাশি ‘The Seoul Times’ (South Korea) ও ‘Blitz’ (Bangladesh) এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
লেখালেখির জগতে প্রবেশ
লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল শুরু থেকেই, তবে তা পরিণত রূপ পায় দায়িত্ববোধ ও অনুরাগের সংমিশ্রণে।
তিনি বলেন, “আমি এখন দায়িত্ববোধ ও প্রগাঢ় অনুরাগ থেকে লিখি।”
বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী নানা নামী মিডিয়া যেমন:South China Morning Post, Asia Times, Modern Diplomacy, The Geopolitics, Eurasia Review, Arabian Post এর মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ঘানা, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পত্রিকাগুলোতেও নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু বিস্তৃত ভূরাজনীতি, সামরিক কৌশল, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, সমাজ-সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই তিনি সমাজের গভীর বাস্তবতাকে যুক্তি ও তথ্যের আলোয় বিশ্লেষণ করেন।
প্রেরণার মানুষ ও কলমের শিক্ষা
এম এ হোসাইনের কলাম লেখার প্রেরণার উৎস ছিলেন একজন সাহসী সম্পাদক জনাব সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী, ব্লিটজ পত্রিকার সম্পাদক। তিনিই তাঁকে লেখার জগতে প্রবেশ করান এবং কলমের দায়বদ্ধতা শেখান। এরপর দেশ-বিদেশের বহু চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন।
দেশে – তারেক শামসুর রহমান, বদরুদ্দীন উমর, জগলুল হায়দার, আবরার হোসেন;
বিদেশে -ব্র্যাট স্টিফেনসন, অরুন্ধতী রায় প্রমুখ লেখক তাঁর লেখার পথের আলোকবর্তিকা।
কলাম: চিন্তা বদলের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র
তাঁর ভাষায়,
“কলাম লেখা এমন এক শিল্প, যা সমাজের চিন্তা ও মননকে মেনুপুলেট করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। পরিবর্তন আনতে হলে কলমই হতে পারে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।”
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া পেলেও দিন শেষে বিশ্বাস করে পত্রিকার শব্দে। ভালো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কলাম মানুষকে ভাবায়, যুক্তি শেখায়, এবং দায়িত্ববোধ জাগায় এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নিয়মিত লেখেন।
হুমকি, ভয়, এবং দৃঢ়তার গল্প
লেখালেখির শুরুর দিকে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বজরঙ্গী দল তাঁকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়, আবার মালয়েশিয়ার নির্বাচনের সময় নাজিব রাজ্জাক সরকারের বিরুদ্ধে লেখা প্রকাশের পর সেখানে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার নজরেও পড়েন তিনি।
প্রথমদিকে এই ঘটনাগুলো তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিল, কিন্তু মেন্টরদের পরামর্শ তাঁকে নতুনভাবে শক্তি দেয়।
তাঁরা বলেন, “একজন লেখকের কাজ হলো সমাজে অনুরণন সৃষ্টি করা যা ইতিবাচক বা নেতিবাচক, দুটোই প্রভাবের অংশ।”
এই উপলব্ধিই তাঁর লেখার প্রতি আরও দায়বদ্ধতা ও সাহস জুগিয়েছে।
কলামবিমুখতার কারণ
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন লেখালেখি আগের চেয়ে সহজ হলেও তরুণদের মধ্যে কলাম লেখার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এমন বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন এম এ হোসাইন।
তাঁর মতে, এর তিনটি বড় কারণ আছে-
১. ধৈর্যের অভাব ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি,
২. পাঠাভ্যাসের অবক্ষয়,
৩. মেন্টরশিপ ও দিকনির্দেশনার ঘাটতি।
তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়, কিন্তু কলাম লেখার চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে। তাই অনেকে এই পথ থেকে সরে যাচ্ছে।”
তরুণদের আগ্রহী করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তাঁর প্রস্তাব – কলাম রাইটিং কর্মশালা, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, তরুণ কলাম প্রতিযোগিতা এবং সমালোচনাকে সহনীয়ভাবে গ্রহণের পরিবেশ গড়ে তোলা।
তাঁর ভাষায়,
“কলাম লেখা শুধু মত প্রকাশ নয় এটি সময়, সমাজ ও চিন্তার সাক্ষ্য রেখে যাওয়া।”
তরুণ লেখকদের সুযোগ ও দিকনির্দেশনা
তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকেই তরুণদের লেখা গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যে তিনি নিজে প্রায় ২০–২৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিয়ে কলাবোরেট করে লেখা শুরু করিয়েছেন, যারা এখন নিয়মিত দেশি–বিদেশি মিডিয়ায় লিখে যাচ্ছেন। বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি পরামর্শ দেন “তরুণদের উচিত এমন বিষয় বেছে নেওয়া, যা সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলে। আবেগ নয়, যুক্তি ও তথ্যনির্ভর লেখা জরুরি।” রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি এই বিষয়গুলো নিয়ে তরুণদের চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন তিনি।
লেখার মান উন্নয়নের পথ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই লেখালেখির অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। এম এ হোসাইনের এই পরামর্শের মূল চাবিকাঠি তিনটি শব্দে নিহিত:
পড়, পর্যবেক্ষণ করো, এবং অনুশীলন করো।
প্রতিদিন কিছু সময় প্রবন্ধ, সাহিত্য ও সংবাদপত্র পড়া উচিত; এতে ভাষা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও চিন্তা সংগঠনের দক্ষতা বাড়ে। সাহিত্য ও বিতর্ক ক্লাবে অংশ নেওয়া যুক্তি ও প্রকাশের অনুশীলন শেখায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখা ও অভিজ্ঞ লেখকদের লেখা বিশ্লেষণ করা।তাঁর ভাষায়, “মাথায় যত বেশি তথ্য থাকবে, তত বেশি লেখক সমাজের চিন্তা শক্তিকে প্রভাবিত করতে পারবে।”
অনুপ্রেরণা ও সফলতার পেছনের মানুষ
তাঁর সফলতার পেছনে তিনি কৃতজ্ঞ পাঠাভ্যাসের প্রতি এবং সমালোচকদের প্রতি। ‘আমার পড়ার অভ্যাস আমাকে তৈরি করেছে, আর সমালোচকরাই আমাকে শাণিত করেছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিশ্বাস
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে এম এ হোসাইন বলেন, “আমি চাই আমার লেখা আরও খুরধার হোক। কে কী বললো, বা অদেখায় থেকে গেল কিনা, তার পরোয়া করি না। আত্মতৃপ্তিই আমার কাছে সাফল্যের মাপকাঠি।” তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট সমাজে প্রভাব সৃষ্টি করা, মানুষকে ভাবতে শেখানো, এবং কলমকে ব্যবহার করা পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে।
তরুণদের প্রতি তাঁর বার্তা
“পড়, পড়, এবং পড়।” ভালো লেখক হতে হলে ভালো পাঠক হতে হবে এই সত্য তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন। তাঁর মতে, পৃথিবী এখন জ্ঞানের সর্বোচ্চ যুগে অবস্থান করছে; তাই মানুষকে আকর্ষণ করা সম্ভব একমাত্র জ্ঞানের মাধ্যমেই। এবং সেই জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উপায় হলো অবিরাম পাঠ ও শেখা।
এম এ হোসাইন শুধু একজন কলাম লেখক নন, তিনি একজন চিন্তার অনুঘটক। তাঁর লেখায় সাহস আছে, আছে যুক্তির গভীরতা এবং দায়িত্ববোধের মর্ম। তিনি প্রমাণ করেছেন একটি কলম সমাজের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারে, যদি তা সত্য, জ্ঞান ও মানবিকতার পক্ষে ব্যবহৃত হয়।
YSSE–এর পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। তাঁর চিন্তার গভীরতা, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ প্রজন্মের জন্য হবে অবিস্মরণীয় অনুপ্রেরণা।
এই রকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক
আতিয়া ইবনাত রিফাহ্
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
