ভয়েস ওভার শুধু একটি পেশা নয় এটি একধরনের শিল্প। শব্দের ভেতর দিয়ে আবেগ, গল্প, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রভাব পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতাই একজন ভয়েস আর্টিস্টকে আলাদা করে তোলে। একটি সঠিক টোন, একটি নিখুঁত উচ্চারণ কিংবা একটি আবেগঘন উপস্থাপন সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি শক্তিশালী কণ্ঠসত্তা।

আজ আমরা কথা বলেছি ভয়েস ওভার জগতের পরিচিত কণ্ঠ বহ্নি শিখা পর্ণার সঙ্গে। জানব তার শুরুর গল্প, সংগ্রাম, সফলতা এবং নতুনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

YSSE: আপু আমাদের সঙ্গে যদি শেয়ার করতেন, কীভাবে ভয়েস আর্ট ও ভয়েস ওভার জগতে আসলেন?

ছোটবেলা থেকে আমাকে যেহেতু গানে দেওয়া হয়েছিল, আমি গান শিখেছি, গান করেছি। এরপর নিজে থেকে আবৃত্তি করেছি। যার কারণে বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া হতো এবং অনেক সময় উপস্থাপনাও করেছি। ওই জায়গা থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভয়েস দেওয়া শুরু করি। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভয়েস ওভার করার অফার আসতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে ভয়েস ওভার জগতে আমার আসা।

YSSE: আপনার ক্যারিয়ারে শুরুর সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল?

শুরুর দিকে আমার সাইনাসের, মানে ঠান্ডাজনিত সমস্যা ছিল ভয়েসে। সেটা রিকভারি করতে হয়েছে এবং অনেক বেশি প্র্যাকটিস করতে হয়েছে। আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিভাইস। ভালো মানের মাইক্রোফোন ও রেকর্ডিং সেটআপ না থাকাটা একটা বড় ইস্যু ছিল। পরে আমি যেখানে কাজ করতাম, সেই অফিসে ভালো মাইক্রোফোন সেটআপ ছিল। তখন ভয়েস ওভার করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

YSSE: একটি সফলতার গল্প যদি শেয়ার করতেন – এমন কোনো প্রজেক্ট বা কাজ যা আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল।

আমি যেখানে কাজ করতাম, সেটা একটি ভিডিও মার্কেটিং এজেন্সি ছিল। সেখানে একটি বিজ্ঞাপনের জন্য ভয়েস খোঁজা হচ্ছিল। তখন আমার ভয়েস শুনে আমাকে স্ক্রিপ্ট পড়তে বলা হয়। স্ক্রিপ্টটা আমিই লিখেছিলাম। সেটা পড়ার পর সবাই খুব পছন্দ করে। ওই প্রজেক্টের পর থেকে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ভয়েস ওভার আমিই করতে শুরু করি এবং ক্লায়েন্টরাও আমার ভয়েস পছন্দ করতে থাকে। এটাকেই বলতে গেলে আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।

YSSE: অনেকেই অভিনয়, মিডিয়া, ব্রডকাস্টিং বা অন্যান্য সৃজনশীল পেশায় যেতে চায়। আপনি কেন Voice Over ফিল্ড বেছে নিলেন? এবং এই ফিল্ডে দীর্ঘদিন টিকে থাকার হ্যাকস কী?

আমি ভয়েস ওভার ফিল্ডটা বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে এখানে সৃজনশীলতা আছে এবং চ্যালেঞ্জও আছে। বিজ্ঞাপনের ভয়েস একরকম, ডকুমেন্টারির ভয়েস আরেকরকম, উপস্থাপনার টোন আবার আলাদা। নিজেকে সবসময় মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হয় – কিভাবে কথা বলব, কোন টোনে বলব। দীর্ঘদিন টিকে থাকতে হলে নিজের ভয়েস ভালো রাখতে হবে, নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে হবে এবং নিজেকে আপগ্রেড করতে হবে। বিভিন্ন টোনে অনুশীলন করতে হবে। আর পর্দার আড়ালে কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মানুষের মধ্যে একটা কৌতূহল থাকে কে কথা বলছে? এই বিষয়টা আমার ভালো লাগে।

YSSE: একজন সফল Voice Over Artist হওয়ার জন্য কোন গুণাবলি সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রোতার সাথে কানেক্ট করতে পারা। আমার ভয়েস শুনে যেন মানুষ আকৃষ্ট হয় এবং বার্তাটা গ্রহণ করতে পারে। আমি যেই প্রোডাক্ট নিয়ে কথা বলি, সেটা যেন মানুষের ভালো লাগে। অনুষ্ঠান হলে অনুষ্ঠানেই যেন শ্রোতার আগ্রহ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে ধৈর্য দরকার, ভয়েস কন্ট্রোল দরকার। কিভাবে কথা বললে ভালো লাগবে, সেটা বুঝতে হবে। নিয়মিত রেওয়াজ করতে হয়, গরম জল দিয়ে গার্গল করতে হয়, গলার যত্ন নিতে হয়। বেশি চিৎকার করা যায় না।

YSSE: আপনার জীবনের টপ ৩ প্রায়োরিটি কী? এবং এমন একটি ভ্যাল্যুয়েবল উপদেশ যা আপনার ক্যারিয়ার গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে। 

আমার জীবনের টপ থ্রি প্রায়োরিটি বলতে গেলে প্রথমত নিজে ভালো থাকা, নিজে শান্তিতে থাকা। তাহলে আমি সবকিছু খুব ভালোভাবে করতে পারব। দ্বিতীয়ত, আমি কাজকে অনেক গুরুত্ব দিই। তৃতীয়ত আমার কাজের মাধ্যমে যেন মানুষ উপকৃত হয়, কারো উপকারে আসে এমন কাজই করতে চাই। ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে আমার উপদেশ হচ্ছে, কাজ করতে হবে। মানুষ যেন মনে রাখে, সেই জন্য অবশ্যই কাজ করতে হবে। টাকা-পয়সা জরুরি, কিন্তু এমনভাবে ইনকাম করতে হবে যেন নিজের একটা জায়গা তৈরি করা যায়। এটাই আমার মোটিভেশন।

YSSE: যারা ভবিষ্যতে Voice Over বা মিডিয়া ফিল্ডে ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাদের জন্য আপনার কিছু সাজেশন কী?

যারা ভয়েস ওভার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে অনেক বেশি। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। আমি যখন কনফিডেন্ট থাকব যে হ্যাঁ, আমার দ্বারা সম্ভব—তখন কাজটা অটোমেটিক হয়ে যাবে।

YSSE: আপনি যদি কোনো স্টুডিও, মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বা সৃজনশীল উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকেন সেটা নিয়ে কিছু বলতেন।

আমি আগে যে ভিডিও মার্কেটিং এজেন্সি ‘টপ ফাইভ’-এ কাজ করেছি, সেটার সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলাম। এছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি এবং কাজ করেছি। মিউজিক নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করা হয়। এর আগে আমি চট্টগ্রাম টেলিভিশনেও কাজ করেছি। বর্তমানে ভয়েস ওভারের একটি পরিচিতি থাকার কারণে বিভিন্ন অফার আসে, বিশেষ করে আবৃত্তির অফার বেশি আসে। সেগুলোর সাথেই মূলত যুক্ত।

YSSE: ভয়েস ট্রেনিং ও নিয়মিত অনুশীলন নিয়ে শেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ যদি দিতেন।

ভয়েস ট্রেনিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেকে অনেক বেশি পুশ করতে হয়। তানপুরা অনুযায়ী সি শার্প, বি শার্প স্কেলে সা থেকে শুরু করে প্র্যাকটিস করতে হয়। জিহ্বার ব্যায়াম করতে হয়। কোনো প্রোগ্রামের আগে নিজেকে কিভাবে বুস্ট করা যায় বা মুখের জড়তা কাটানো যায় সেদিকে জোর দিতে হয়। ক, চ, ট, ত, প—এই ব্যঞ্জনবর্ণ এবং স্বরবর্ণগুলো পরিষ্কারভাবে উচ্চারণের প্র্যাকটিস করতে হয়। অনেকের আঞ্চলিক টান থাকে, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেই টানও দূর হয়ে যায়।

এরকম ব্লগ পড়তে এখানে, ক্লিক করুন 

লেখক

আহমেদ আফিফ মুরাদ

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE