হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র হিমু। হিমু পড়ে হিমু হতে চাইনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। হিমুকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মোট ২১টি উপন্যাস রচনা করেছেন। সেই ২১ টি উপন্যাস নিয়ে গঠিত হয়েছে হিমুসমগ্র এবং হিমুসমগ্র-২।
হিমু চরিত্রের যাত্রা শুরু “ময়ূরাক্ষী” উপন্যাসের মাধ্যমে। হিমু একটি জটিল চরিত্র। হিমু চরিত্রটির ধারণা হুমায়ূন আহমেদ লিখেছে তার সৃষ্ট মিসির আলি চরিত্রের বিপরীতে। মিসির আলি যুক্তিতে প্রবল বিশ্বাসী। কিন্তু হিমু অযুক্তিতে বিশ্বাসী একটি চরিত্র। হিমুকে নিয়ে লেখা সকল উপন্যাসে রয়েছে অপ্রাকৃতিক, অযৌক্তিক জিনিসের উপর বিশ্বাসের ছোঁয়া।
হুমায়ূন আহমেদ হিমুকে সবার সামনে পরিচয় করিয়েছেন এক ছন্নছাড়া, বেকার যুবক হিসেবে। যার পরনে সর্বদা থাকে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি। এই পাঞ্জাবি গায়ে হিমু হাটে ভবঘুরে হয়ে। হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট হিমু চরিত্রের মায়া নামক জিনিসের দিকে যাওয়া বারণ। “মহাপুরুষ” হাওয়া হিমুর একমাত্র সাধনা। আর হিমুকে মহাপুরুষ বানানোর কারিঘর তার বাবা। উপন্যাস অনুযায়ী হিমুর বাবার একটি ডাইয়েরি রয়েছে যেখানে তিনি হিমুর উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ করেছেন তার মহান বাণী। যদিও সকল উপন্যাসে হিমুর বাবা ও মা উভয়ই মৃত। তার মায়ের মৃত্যু নিয়েও আছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
যাহোক, হিমু উপন্যাসে রয়েছে হিমুর অসংখ্য ভক্ত। তার মধ্যে বাদল অন্যতম। হিমু নাম বলতেই বাদল পাগল। হিমুর পদাঙ্ক অনুসরণ করা যেন বাদলের একনিষ্ঠ সাধনা। হিমু যা বলে বাদলও তাই মানে। তবে হিমুকে একবারে সহ্য করতে পারে না বাদলের বাবা অর্থাৎ হিমুর খালু। তিনি সর্বদা বাদলকে হিমু থেকে দূরেই রাখতে চান। উপন্যাস অনুযায়ী, হিমুর খালা সম্পর্কেও জানাই। তার খালা হিসেবে আছে, মাজেদা খালা ও ফাতেমা খালা। মাজেদা খালা হিমুকে অনেক দেখতে পারে এবং নানান সময় নানান কাজ দিয়ে বেড়ান। অন্যদিকে ফাতেমা খালার স্বামী একটি উপন্যাস অনুযায়ী মৃত। যার ফলে পুরো সম্পত্তির মালিক তিনি।
হিমু চরিত্রের সাথে আরেক চরিত্রের খুব খুনসুটি দেখা যায়। সে হলো রূপা। রূপাকে চরিতার্থ করা হয়েছে একজন সরল এবং নিষ্পাপ মেয়ে হিসেবে। সে সর্বদা উপকারি। হিমুর জন্য সে সব করতে পারে। সে প্রতিনিয়ত হিমুর অপেক্ষায় থাকে। তবে হিমুদের তো মায়ায় জড়াতে নেই। তাই হিমু কখনো তাকে ধরা দেয় না। ডুব দেয় অজানায়।
হিমুর সাথে থানার ওসিদের পাল্লা পড়তে অনেক উপন্যাসেই দেখা গিয়েছে। অনেকবার হিমুকে জেলেও যেতে হয়েছে। তবে নিজের বুদ্ধি এবং ভড়কে দেওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি প্রত্যেকবারই সে ছাড়া পেয়েছে। তাছাড়া যেখানেই ডাকাত, চোর, সাধু, সন্ন্যাসী, পির, ফকিরের অবস্থান সেখানে পাওয়া যায় হিমুর সন্ধান। হিমু চরিত্রটি মানুষকে ভড়কে খুবই মজা পাই। হিমু তাকে তৈরি করে বিভ্রান্তি। এছাড়া তার ইনটুইশন ক্ষমতা প্রবল হওয়ায় সে নানান সময় ভবিষ্যত বাণী করে চলে আসে মানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে।
হিমুসমগ্র সম্পর্কে নিজস্ব মতামত এবং উপন্যাসের অসামঞ্জস্যসমূহ:
হুমায়ূন আহমেদের হিমুসমগ্র আমার কাছে একটি অনন্য উপন্যাস মনে হয়েছে। তিনি এই চরিত্রটিকে সবার থেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন। এছাড়া উপন্যাসগুলো পড়ে নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবিও পরিলক্ষিত হয়ে যায়। কারণ হিমু চরিত্রের সাথে আমাদের সবারই কম বেশি মিল আছে। হিমুকে তিনি যুক্তির বাইরে একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। যা আমাদের জাতীয় জীবনেও দেখা যায়। আমাদের অসংখ্য চিন্তা ভাবনায় কিন্তু বাস্তবতা পরিপন্থি প্রায় সময়।
অনেকের মতে, হিমু একটি ডার্ক চরিত্র। যার জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই। তার কাজ শুধু মহাপুরুষ হয়ে ঘুরে বেড়ানো। সে ‘মায়া’ নামক জিনিস হতে দূরে। যদিও সব হিমু পড়ে আমার তা মনে হয় নি। আমার মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ হিমুকে মায়াহীন পুরুষের মধ্যে গোপণে মায়া থাকা একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কারণ দেখা গিয়েছে, প্রত্যেক উপন্যাসের শেষে হিমুর সাথে যারা সমস্যা নিয়ে হাজির হয় তাদের গল্পের শুভ সমাপ্তি হয়েছে। কিছু কিছু উপন্যাসে আবার অশুভ সমাপ্তির মধ্যেও শুভ সমাপ্তির গল্প খুঁজে পেয়েছি। এক্ষেত্রে বলা যায়, হিমু তার বাবার যে ইচ্ছা তাকে ‘মহাপুরুষ’’ বানানো সে ইচ্ছা রাখতে পুরোপুরি সফল হয় নি। এছাড়া হিমুর মায়ের প্রতি হিমুর অসম্ভব মায়া অনুভব করেছে। যার ফলে সকল কিশোরীর মধ্যে সে তার মাকে দেখতে পাই বলে আমি মনে করি। তাছাড়া, হিমুসমগ্র উপন্যাসগুলো জগতের দুর্নীতি এবং খারাপ কাজের পরিপন্থি। হুমায়ূন আহমেদ জগতের হিমুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে এসব খারাপ কাজের বিরুদ্ধে নীরবেই তার লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন।
হিমুকে নিয়ে লেখা উপন্যাসসমূহ যে একটি জনপ্রিয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমার কাছে হিমু উপন্যাসের কিছু অসমাঞ্জস্য সামনে এসেছে:
- হিমুসমগ্রের উপন্যাসগুলোর মধ্যে লেখক উপন্যাসগুলোর নির্দিষ্ট ধারা বজায় রাখতে পারেন নি। পড়লে মনে হবে, প্রত্যেকটি উপন্যাস একটি আরেকটি থেকে আলাদা। কয়েকটিতে দেখা যায় উপন্যাসের চরিত্র বাদল বিবাহিত। আবার কয়েকটিতে বাদল বিবাহিত নয়। এছাড়া কয়েকটি উপন্যাসে বাদলের বউ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে।
- হিমু পড়নে সবসময় পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি থাকে তবে কিছু উপন্যাসে হিমুর পাঞ্জাবিতে পকেট ছিল।
কিছু অসমাঞ্জস্য থাকলেও হিমু যে হিমুই থেকেছে তাতে কোনো বিতর্ক নেই। হিমু এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে অনেক ব্যক্তিই হিমুর অনুকরণ করে খালি পায়ে রাস্তায় রাস্তায় ভবঘুরে হয়ে হেঁটেছে। আর তার মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। যুগ যুগ ধরে পাঠকের মনে এই চরিত্রটি যে বেঁচে থাকবে এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
এই রকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন
লেখক
প্রত্যয় কান্তি দাশ
ইন্টার্ন, কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
