আপনি কি মনে করেন শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা কাগজের সার্টিফিকেট আপনাকে একটি সফল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারবে?
বর্তমান যুগে চাকরির বাজারটা প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির বিকাশ আর দক্ষ কর্মীর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপর জোর দেয়, সেখানে বাস্তব কর্মক্ষেত্র চায় হাতে কলমে কাজ করার সক্ষমতা। এই দুয়ের মধ্যকার ব্যবধান পূরণে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রখ্যাত ফিউচারিস্ট আলভিন টফলার তার ‘ফিউচার শক’ বইটিতে একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন যা এই প্রসঙ্গের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। তিনি বলেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর নিরক্ষর তারা হবে না যারা লিখতে বা পড়তে জানে না, বরং তারা হবে নিরক্ষর যারা শিখতে, ভুলে যেতে এবং পুনরায় শিখতে জানে না। ভোকেশনাল ট্রেনিং মূলত এই পুনরায় শেখার এবং নিজেকে সময়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াই শেখায়। এটি মানুষকে নমনীয় করে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে টিকে থাকার সাহস যোগায়।
ভোকেশনাল ট্রেনিং এর মাধ্যমে সহজেই হাতে কলমে কাজ শিখে দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করা যায়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এই ব্যবধান কমাতে ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যারা গতানুগতিক শিক্ষার পাশাপাশি দ্রুত কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।
ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান এবং দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হয়। এটি শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে কাজের জন্য প্রস্তুত করে। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, ইলেক্ট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং, অটোমোবাইল ম্যাকানিক, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং, ওয়েল্ডিং, ড্রেসমেকিং, বিউটিফিকেশন এগুলো ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রোগ্রামের কিছু জনপ্রিয় উদাহরণ। বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে।
প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীরা চাইলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, নির্মাণ সংস্থা, শিল্প কারখানা অথবা অটোমোবাইল সার্ভিস সেন্টারগুলোতে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। এছাড়া বিদেশেও দক্ষ শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনেকে আবার নিজের ব্যবসা শুরু করার মতো আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতা অর্জন করেন।
অবশ্য বাংলাদেশে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক সময় সমাজে এখনো ধারণা রয়ে গেছে যে ভোকেশনাল ট্রেনিং শুধুমাত্র যারা ভালো ফলাফল করতে পারে না তাদের জন্য। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও ভোকেশনাল ট্রেনিং নিচ্ছেন কারণ তারা জানেন এটি তাদের ক্যারিয়ারে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
তাছাড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, দক্ষ প্রশিক্ষকের সংকট এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ের ঘাটতিও একটি সমস্যা। তবে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় দেশব্যাপী ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে।
তাছাড়া বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে অনেক গতানুগতিক চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু যে কাজগুলোতে মানুষের সৃজনশীলতা, সরাসরি হাতের স্পর্শ এবং জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলোর চাহিদা কখনোই কমবে না বরং বাড়বে। একজন দক্ষ কারিগর বা টেকনিশিয়ানের কাজ কোনো রোবট দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের এই ব্যবহারিক দক্ষতার দিকেই ঝুঁকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শেখার কোন শেষ নেই। একবার প্রশিক্ষণ নিলেই থেমে থাকলে চলবে না। প্রযুক্তি এবং কর্মক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। যারা নিজেদের দক্ষতা ক্রমাগত আপডেট করতে থাকবেন, তারাই সফলতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারবেন।
সর্বোপরি, ভোকেশনাল ট্রেনিং বা বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি এমন একটি সুযোগ যা আপনার সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করার এবং একটি উজ্জ্বল ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার পথ বাতলে দিতে পারে। তাই যারা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছেন, তাদের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং একবার বিবেচনা করা উচিত। এটি হতে পারে আপনার স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। তাই, ডিগ্রি নয় বরং দক্ষতাকেই আপনার পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলুন।
এই ধরনের আরও ব্লগ পড়তে এখানে, ক্লিক করুন।
লেখক,
মো: কাইয়ুম
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং বিভাগ
YSSE
