চট্টগ্রামের সুপ্রাচীন ইতিহাসের ধারণা থাকলেও সেরকম কোন নিদর্শন খুজে পাওয়া যায়নি। সীতাকুন্ডের পাহাড়ী এলাকায় প্রস্তরযুগের কিছু অস্ত্রের নমুনা পাওয়া গেছে। প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় ভৌগোলিকদের বর্ণনায় চট্টগ্রামের কিছু স্থানের উল্লেখ পাওযা যায়। ইতিহাসবেত্তা ড. নলিনীকান্ত ভট্টাচার্য প্লিনিরপেরিপ্লাসের ক্রিসকে চট্টগ্রামের দ্বীপ সন্দ্বীপ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আবর ল্যাসেনতো পেন্টাপোলিসকেই চট্টগ্রাম মনে করেন। সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের হাত বদলের ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন ইতিহাস সংস্কৃতির তৈরি হয়েছে। এরই ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত তালিকা ২য় অনুচ্ছেদে নিচে তুলে ধরা হলো।
☞ পার্সিভাল হিলঃ চন্দনপুরার বিপরীতের এক উচ্চ পাহাড়ে ‘ব্রেডন পার্সিভাল’ নামের এক পর্তুগিজ বাসিন্দা সপরিবারে বসবাস করার জন্য বাড়ি তৈরি করেন। এই পার্সিভাল পরিবারের একাধিক সদস্য পরবর্তীতে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। আরেক সদস্য ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় চট্টগ্রামের পার্সিভাল পরিবারের শেষ পুরুষ চট্টগ্রাম ত্যাগ করে লন্ডনবাসী হন।
☞ পাথরঘাটাঃ কথিত আছে- পীর বদর শাহ আরব দেশ থেকে সমুদ্রপথে একটি পাথরের উপর সওয়ার হয়ে চট্টগ্রামে আসেন। এবং সেই পাথরখানি কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী একটি স্থানে থেমে যাওয়ার পর তিনি তীরে উঠে আসেন। তখন থেকে এই জায়গার নাম ‘পাথরঘাটা’ নামে খ্যাত হয়৷
☞ এনায়েত বাজারঃ এনায়েত খাঁ নামের একজন মোগল সেনাপতির নামানুসারে এই নামকরণ হয়েছিল। এনায়েত বাজার ছিল তৎকালীন মোগল সেনাবাহিনীর মুসলমান সেনাদলের আবাসস্থল।
☞ টাইগার পাসঃ দু’পাশে উঁচু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এই রাস্তাটি সোজা চলে গেছে সমুদ্রে। ১৯ শতকের শেষার্ধেও এসব পাহাড় ছিল জনবসতিহীন, গভীর জঙ্গলাবৃত এবং বাঘের আখড়া। ১৮৬২ সালে চট্টগ্রামে কর্মরত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান মিস্টার ক্লে’র আত্মজীবনী থেকে জানা যায়- এখানে নিয়মিত বাঘের আক্রমনে লোকে প্রাণ হারাতো, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে এই রাস্তা ধরে বাঘ চলাচল করতো বিধায় এটি “টাইগার পাস” নামে খ্যাত হয়। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতির স্মারক হিসেবে বর্তমানে টাইগার পাস এলাকায় টাইগার বা বাঘের মূর্তি স্থাপিত আছে।
☞ বাঘ ভ্যালিঃ চট্টেশ্বরী রোডের ওয়ার সিমেট্রির সন্নিকটস্থ এই পাহাড়ি এলাকাটি একসময় ছিল জনমানবহীন ও জঙ্গল আবৃত- সেখানে দিনে দুপুরে বাঘ বিচরণ করতো। এই এলাকায় বাঘ ধরার জন্য ফাঁদ পাতার ব্যবস্থা ছিল, জীবন্ত বাঘ ধরতে পারলে মিলতো পুরষ্কার। এভাবেই এলাকাটি বাঘভ্যালি বা বাঘের উপত্যকা হিসেবে খ্যাত হয়।
☞ খুলশীঃ আরবি ও ফারসি ভাষার প্রচলিত “খোলাসা” শব্দ থেকে খুলশী নাম উদ্ভুত। খোলাসা অর্থ খোলামেলা, জনবিরল স্থান।
☞ কাজির দেউড়িঃ কাজি মির আবদুল গণির নামানুসারে এই এলাকা খ্যাত হয়েছে। ১৮ শতকের গোড়ার দিকে তিনি দিল্লী গমন করে তৎকালীন মোগল সম্রাটের কাছ থেকে চট্টগ্রামের কাজী (বিচারক) এর দায়িত্ব লাভ করেন এবং স্টেডিয়ামের পূর্বদিকে নিজের দেউড়ি (বহির্বাড়ি) ও মসজিদ স্থাপন করেন।
☞ আসাদগঞ্জঃ পটিয়া থানার বড় উঠান গ্রামনিবাসী ১৮ শতকের প্রখ্যাত জমিদার আসাদ আলী খাঁ’র নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ হয়েছে।
☞ বকশীর হাটঃ ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে বাঁশখালীর নিবাসী বকশী হামিদ নামের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই বকশীর হাট স্থাপন করেন। বাঁশখালীর ইলসা গ্রামে বকশী হামিদের নামে দিঘি, মসজিদ ইত্যাদি নিদর্শন আজো বিদ্যমান।
☞ খাতুনগঞ্জঃ উনবিংশ শতকে চট্টগ্রামের একজন অভিজাত, গুণী ও খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন খান বাহাদুর হামিদউল্লাহ খাঁ। তিনি ফারসি ভাষায় “তারিখে হামিদী” শিরোনামে প্রথম চট্টগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। হামিদউল্লাহ খাঁ’র ২য় পত্নীর নাম ছিল- খাতুন বিবি। কালক্রমে তাঁর স্ত্রী খাতুন বিবির নামে এই খাতুনগঞ্জ গড়ে উঠে।
☞ রহমতগঞ্জঃ ১৬৯৮ সালে নবাব রহমতুল্লা চট্টগ্রামের শাসনকর্তা নিয়োগ হলে এই স্থান তাঁর নামে পরিচিত হয়ে উঠে। বর্তমান জে.এম.সেন হলের উত্তর পার্শ্বে নবাব রহমতুল্লাহর কবর বিদ্যমান রয়েছে।
☞ ফিরিঙ্গি বাজারঃ ১৬ শতকের শুরুর দিকে চট্টগ্রামে পর্তুগিজ বণিকরা আগমন করে। তারা এদেশে “ফিরিঙ্গি” নামে খ্যাত ছিল। অত্র এলাকাটি ছিল ফিরিঙ্গি বণিকদের আড়ত।
☞ রেয়াজুদ্দিন বাজারঃ এই এলাকাটি একসময় ছিল জমিদার দেওয়ান বৈদ্যনাথের বাগানবাড়ি। এখানে সেগুনবাগিচা ছিল। পরবর্তীতে এই এলাকাটি কিনে নেন চট্টগ্রামের প্রথম মুসলমান বিএ, বিএল শেখ রেয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির পিতা শেখ মোঃ ওয়াশীল। শেখ রেয়াজুদ্দিন এই এলাকার প্রভূত উন্নয়ন ঘটালে এটি তাঁর নামে পরিচিত হয়ে উঠে।
☞ চেরাগী পাহাড়ঃ কথিত আছে- আরব দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত বদর শাহ নামক এক সুফি সাধক মাটি নির্মিত একটি চেরাগ বা চাটি হাতে নিয়ে সমুদ্রে পাথরের উপর আরোহন করে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছান। তখন চট্টগ্রাম ছিল গভীর অরণ্যাবৃত এবং জ্বীনপরীর আবাসস্থল। বদর শাহ একটি অনুচ্চ পাহড়ে উঠতে গেলে জ্বীনপরীরা বাধা প্রদান করে এবং থাকার অনুমতি দেয়না। তখন বদর শাহ রাতের অন্ধকারে হাতের চেরাগটি পাহাড়ে রেখে জ্বালাবার স্থানটুকু দিতে অনুরোধ করলে জ্বিনেরা রাজি হয়। কিন্তু চেরাগ জ্বালাবার পর চেরাগের তেজ সহ্য করতে না পেরে জ্বিনেরা স্থান ত্যাগ করে এবং বদর শাহ সেখানে ইবাদাতের স্থান তৈয়ার করেন। উল্লেখ্য “চেরাগী পাহাড়” টি “চাটির পাহাড়” নামেও পরিচিত, চাটি অর্থ মৃৎপ্রদীপ। অনেকে ধারণা করেন- এই “চাটি” শব্দ থেকেই চাটিগাঁ> চাটগাঁ> চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। বর্তমানে এই চেরাগী পাহাড়ে চেরাগ সদৃশ একটি সুন্দর স্থাপনা নির্মিত আছে।
লেখক
ফারিহা আলিফ
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
