লোক সঙ্গীত বাংলাদেশের সঙ্গীতের একটি সমৃদ্ধ ধারা। এটি মূলত বাংলার নিজস্ব সঙ্গীত। গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনের কথা, সুখ, দুঃখের কথা তুলে ধরা হয়েছে এই সঙ্গীতে। এর রয়েছে অনেক ভাগ । এটি একটি দেশের বা দেশের যেকোনো অঞ্চলের সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। যেমন ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি, গম্ভীরা সহ আরো অনেক কিছু।

 

গুণাবলি 

এসকল সঙ্গীতের যেসব গুণ লক্ষ্য করা যায়:-

  • মৌখিকভাবে লোকসমাজে প্রচারিত।
  • সম্মিলিত বা একক কণ্ঠে গাওয়া যেতে পারে।
  • প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের মুখে মুখে এর বিকাশ ঘটে।
  • সাধারণত নিরক্ষর মানুষের রচনায় এবং সুরে এর প্রকাশ ঘটে।
  • আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চারিত হয়।
  • প্রকৃতির প্রাধান্য বেশি ।
  • দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রকাশ পায়।
  • গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন যাপন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

লোকসঙ্গীতের সুর

লোকসঙ্গীতকে মোটামুটিভাবে চার শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথম শ্রেণির সুর ‘সা রা মা পা’, দ্বিতীয় শ্রেণির ‘সা গা মা পা’, তৃতীয় শ্রেণির ‘সা রা গা পা’ এমনিভাবে আরোহণ করে এবং চতুর্থ শ্রেণির সুর ‘সা রা গা মা পা’ এমনিভাবে পঞ্চম পর্যন্ত সরলভাবে আরোহণ করে। সুরের এ বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, লোকসঙ্গীতে তা কঠোরভাবে পালন করা হয়। লোকসঙ্গীতের আরও দুটি দিক হলো: ক. সত্যিকার লিরিকধর্মী গান সুর ছাড়া শুধু কথায় যার গতি পঙ্গু, যেমন  ভাটিয়ালি, বাউল ইত্যাদি এবং খ. এমন সব গান, যেগুলিকে সুর ছাড়া কেবল গানই নয়, কবিতা বলাও দুষ্কর, যেমন ভাটের গান।

বিশ্বের যাবতীয় লোকসঙ্গীতের মতো বাংলা লোকসঙ্গীতেও পাঁচ স্বরের (pentatonic scale) ব্যবহার দেখা যায়; যেমন সীমান্ত প্রদেশের  গারোসাঁওতাল ও হাজংদের গান। তবে বাংলা লোকসঙ্গীতের স্বাতন্ত্র্য এর বিশিষ্ট রূপভঙ্গি ও সাত স্বরের বিশেষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে। কেবল সুরের দিক দিয়ে নয়, ছন্দের দিক দিয়েও এর মধ্যে নানা বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, রাগসঙ্গীতের উদ্ভবের পশ্চাতে রয়েছে এই লোকসঙ্গীত; আজও বহু রাগ-রাগিণীর নামকরণে এর সাক্ষ্য মেলে। আভের, সাবেরী, মালবী, কানাড়ী, পাহাড়ী, মাঢ়, বঙ্গাল প্রভৃতি জাতির নামের সঙ্গে বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর নামকরণ এই সত্যকেই পরিস্ফুট করে। অন্যদিকে বাংলা লোকসঙ্গীতে কোনো কোনো রাগসঙ্গীতেরও প্রভাব দেখা যায়। ঝিঁঝিট, দেশ, ভৈরবী, ভূপালি, বিভাস প্রভৃতি রাগের স্পর্শ বাংলার লোকসঙ্গীতকে মাধুর্যমন্ডিত করেছে। তবে বাংলা লোকসঙ্গীতে ভাটিয়ালি সুরেরই একচ্ছত্র আধিপত্য। ভাটিয়ালি সুরে যে স্বরের প্রয়োগ হয়, তা রাগসঙ্গীতের খাম্বাজ ও পিলু সুরের সমগোত্রীয়। কখনো কখনো ভীমপলশ্রী ও পটদীপ রাগের সঙ্গেও এর মিল লক্ষ করা যায়। ঠাট বিচারে খাম্বাজ ও কাফী ঠাটের সঙ্গে ভাটিয়ালির নিকট সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। ঝুমুরের সুরভঙ্গির মধ্যেও খাম্বাজ তথা পিলুর আমেজ আছে। বাউলের মধ্যে আছে বেহাগ, খাম্বাজ, ভৈরবী, বিলাবল প্রভৃতি রাগ-রাগিণীর প্রভাব। খাম্বাজ ও কাফী ঠাটের রাগ-রাগিণীর সঙ্গে  বাংলা লোকসঙ্গীতের সুর-নৈকট্য রয়েছে।

বাংলা লোকসঙ্গীতে ঝিঁঝিট রাগের প্রভাব অনেকখানি। প্রায় সব লোকসঙ্গীত (বাউল, ভাটিয়ালি, সারি, মারফতি, মরমি প্রভৃতিতে), এমনকি কীর্তনেও এই রাগের স্বরগ্রাম বহুলভাবে ব্যবহূত হয়। ঝিঁঝিট রাগের দুটি রূপ: প্রথমটি মন্দ্র সপ্তকের ধৈবত পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায় এবং তার স্বররূপ এরকম: সা রা মা/ পা মা গা রা সা ণা্ ধা্ পা্/  পা্ ধা্ সা রা গা মা গা/ ধা্ সা; আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কশৌলি ঝিঁঝিট বা লোকগীতির ঝিঁঝিট, যার স্বররূপ: সা রা মা/ পা মা গা রা সা ণা্ ধা্/ ধা্ সা সা রা গা, রা গা মা। উলে­খ্য যে, অধিকাংশ লোকসঙ্গীতেই স্থায়ী ও বাকি অন্তরাগুলির সুর একই রকম হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ গগন হরকরা রচিত একটি বিখ্যাত গানের উলে­খ করা যায়। গানটির প্রথম পংক্তি হলো: ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।’ গানটির সুররূপে সাতটি শুদ্ধ স্বর এবং মাঝে মাঝে কোমল নিখাদের ব্যবহার হয়েছে। এ গানটিতে কশৌল ঝিঁঝিটের স্বরবিন্যাস ব্যবহূত হয়েছে। ভাটিয়ালিতে খুব বেশি প্রচলিত কশৌলি ঝিঁঝিটের সুররূপটি এরকম: সা রা মা, পা মা গা ধা্ সা ণা্ ধা্, ধা্ সা সা রা গা, রা গা সা। এটি কেবল ভাটিয়ালিতেই নয়, লোকসঙ্গীতের সব ধারায়ই ব্যবহূত হয়।

লোকসুর বিশে­ষণে স্বাভাবিকভাবেই তাল-লয় এবং ছন্দোবৈচিত্র্যের প্রসঙ্গ আসে। তাল-লয়ের দিক দিয়ে লোকসঙ্গীতকে দুভাগে ভাগ করা যায়: দ্রুত লয়ের, যেমন সারি ও ঝুমুর এবং বিলম্বিত লয়ের ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদি। উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া বা চটকা কোনো বিষয়বস্ত্তকে নির্দেশ করে না, কেবল সুরের লয়কেই নির্দেশ করে। চটকা দ্রুত লয়ের, যাকে ঝুমুরের সঙ্গে তুলনা করা যায়; আর ভাওয়াইয়া বিলম্বিত লয়ের, যা ভাটিয়ালির সঙ্গে তুলনীয়। কখনও কখনও অবশ্য ভাটিয়ালি তালবিহীনভাবে অর্থাৎ বৈতালিকেও গাওয়া হয়।

বাংলা লোকসঙ্গীতের সুরগত বৈশিষ্ট্য অন্যান্য দেশের লোকসঙ্গীতের তুলনায় স্বতন্ত্র। অন্যান্য দেশের লোকসঙ্গীত দুই, তিন, চার বা পাঁচ স্বরের সমন্বয়ে গঠিত; কিন্তু বাংলা লোকসঙ্গীত এসব স্বরে গঠিত হলেও তাতে সাতটি স্বরের প্রাধান্য থাকে। সুরবৈচিত্র্যেও বাংলা লোকসঙ্গীত অনেক সমৃদ্ধ এবং একে আরও ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছে রাগসঙ্গীত ও লোকসঙ্গীতের মিশ্রণ। 

 

এরকম আরো ব্লগ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 

লেখক, 

খায়রুল ইসলাম শুভ

ইন্টার্ন,

কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট 

YSSE