মলাঃ ফুটন্ত গরম চা, চায়ের গরম পানির ধোয়াটা ঘোলাটে দেখা চোখের চশমায় লেগে সাদা প্রলেপ পরছে। কি শীত বাবা, আহা! এই শীতে কতই না দৌড়ে বেড়িয়েছি। কই, তখন তো এত শীত অনুভব হয়নি। কি বলিস ঢেলা, তোর মনে আছে?

ঢেলাঃ মনে থাকবেনা কেন? তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নাওয়া যাক, আপনারা সবাই নিশ্চই আমাদের নাম নিয়ে বিভ্রান্তে পরেছেন। কি তাইতো?

গল্পটি আমাদের ছোটবেলাকার। আমরা দুই ভাই চোখে অনেক কম দেখতামএকবার স্কুলে মাস্টরমশাই বললেন তোরা মলা আর ঢেলা মাছ বেশি করে খা এতে, চোখের জোত্যি বাড়বে। সহপাঠীরা কথাটা হাস্যরসাত্মক ভাবে নিয়ে আমাদের নাম দিয়ে দিলো মলা ঢেলা।

যাকগে, কিছু নাম থেকে যাক নাহয় কলমের পাতায়। তবে আমার প্রকৃত নাম মোঃ দেওয়ান শেখ আর আমার ছোট ভাই এর নাম মোঃ মালেক শেখ। মালেক আমার কয়েক মিনিটের ছোট। কিন্তু আমরা মলা এবং ঢেলা মাছ নামেই বেশি পরিচিত।

মলাঃ আজ বুড়ো বয়সে পাড়ি দিয়ে সেই শৈশব জীবনে কাটানো রঙিন দিনগুলোর কথা মনে পরে যাচ্ছে রে ঢেলা, মনে আছে তোর আমরা রোজ সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম সবার আগেতারপর দুজন মিলে যেতাম শীতের সকালের খেজুরের রসের মায়ার মধ্যে চুমুক দিতে। কই তখন এত শীত অনুভব হতো না। 

ঢেলাঃ তখন খোদার দেওয়া প্রানে ছিলো নতুন বল এখন তো খোদা বল কেড়ে নিয়েছে, আর আমাদের তার কাছে ফিরে যাওয়ার দিন গুনা হচ্ছে। রস খেয়ে বাড়ি এসে দেখতাম আমাদের মা উঠে উঠুন ঝাড়ু দিচ্ছে। তবে আমার জীবন দশায় আমার বউকে কখনো এত সকালে উঠে ঝাড়ু দিতে দেখিনিদেখবই বা কি করে শহুরের জীবনে নাই কোনো উঠান, না আছে মানুষের কোলাহল। 

আমার মা আজ গহীন অন্ধকারে ঘুমাচ্ছে, তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি (আমিন)। মলা, তোকে মা বেশি ভালোবাসতো তাইনা? আমি একদিন দেখেছি মা তোকে আচাড়ের বয়ম থেকে একটা জলপাই বেশি দিয়েছে। তখনই বুঝেছি মা মনে হয় আমাকে একটু কম ভালোবাসতো।

মলাঃ হা হা হা হা, ভাই তুই এখনোকথাটা ভুলতে পারলি না। মা আমাদের দুজনকেই অনেক ভালোবাসতো।

ঢেলাঃ হ্যা, তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিলো ঝাটার বাড়ি আর বাশের কুঞ্চির আঘাত। তবে মারবে না কেন আমরা রোজ স্কুল পালাতাম, পালিয়ে মাঠে ফুটবল খেলতাম। অন্যের গাছের ফলমূল পেড়ে খেতাম। আমরা কি মাকে কম কষ্ট দিয়েছি? এসব উদ্ভট কাজকর্মের জন্যই উনি আমাদের শাসন করতেন এবং মারতেন। মলা মনে আছে তুই একবার পুকুরে ডুবে গিয়েছিলি?

মলাঃ হাহা, মনে আছেরে ভাই, মনে আছে। চা টা শেষ কর আগে, ঠান্ডার দিনে গরম চা খাওয়াই ভালো। আমিতো বেশি ছেলে মানুষি করতাম। পুকুর পাড়ে সবাই খেলছিলো, কেন জানিনা আমার খুব জলপরীদের সাথে খেলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। দিলাম ডুব, ভাবলাম আর উঠবোনা যতক্ষন না জলপরি আসে। আর উঠতে পারিনা, সময় মত সবাই না আসলে আমি সত্যি চিরতরে মাছ হয়ে যেতাম! হা হা হা!

ঢেলাঃ হাসিস না, আমরা পুকুরে তখন রোজ গোসল করতাম আর অনেক মাছ ধরতাম। সে কত রকমের মাছ। এখন তো সব ফ্রিজিং করা মাছ খাওয়া হয়। সেই তখনকার সময়ে নিজ হাতে মাছ ধরার আনন্দটাই ছিল আলাদা। এখনকার মাছে আর সেইরকম স্বাদ পাওয়া যায় না। তখন মাছের মাঝে ছিলো স্বাদের পরিপূর্ণ ভান্ডার। তবে বেশ বিরক্তিকর ছিলো দুপুরে মা যখন পড়তে বসাতো।

মলাঃ ঠিক ভলেছিস ভাই, আমার ঐ কবিতাটা একটুও মুখস্ত হতো না,

                         আম পাতা

                  জোড়া জোড়া,

                                 মারবো চাবুক

                        চড়বে ঘোড়া।

তবে মায়ের কড়া শাসনে আমাদের রোজ দুপুর বেলা পড়তেই হতো। আমরা পড়তাম, কখনো ঘুমের ভান করে ঘুমাতাম, কখনো বা ফাঁকি দিয়ে বাইরে যেতাম মাঠে খেলতে। আচ্ছা মাঠ টা কি এখনো আছে ঢেলা?

কি যেন নাম? ওহ হ্যা, ফকির তলার মাঠ। এখানে এক গাদা ফকির বসে ভিক্ষা করতো বলে মাঠের নাম ফকির তলা মাঠ।

ঢেলাঃ মাঠ এখন আর নেই, সেখানে গড়ে উঠেছে নগর, হাসপাতাল, সবাই বিনামূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছে তবে আর খেলাধুলা করতে পারছে না এখনকার ছেলে মেয়েরা।

মলাঃ আমাদের শৈশবের দিন গুলি ছিলো ঐ মাঠকে ঘিরেই, গাছে চড়া থেকে শুরু করে মাটিতে লুটোপুটি খেলা সবই করতাম মাঠে। আবার সন্ধ্যা হলে মা আবারো পড়তে বসাতো, সেই সময়টা আমার কাছে এক আলোকবর্ষ মনে হতো। তবে লোডশেডিং ছিলো যেন আমাদের আশীর্বাদ। দৌড়ে যেতাম সবাই লুকোচুরি খেলতে। অন্ধকারে লুকোচুরি খেলা আমাদের শৈশবকে করে তুলেছিল আরো বেশি সোনালী ও আনন্দময়। 

ঢেলাঃ কিন্তু আমাদের মা যে কড়া শাসনে রাখতেন সেটা কিন্তু ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তিনি তখনো আমাদের জন্যে হ্যারিকেনের ব্যাবস্থা করে দিতেন যাতে করে কোনভাবেই পড়া থেকে বিচ্যুত না হওয়া যায়।

মলাঃ তাই বলে তো এখন তুই সরকারি কর্মকর্তা আর আমি সরকারি ব্যাংক ম্যানেজার।

ঢেলাঃ ঠিক বলেছিস। সেই হ্যারিকেনের আলোর মাঝে জোনাক পোকার আগমন, রাতের মাধুর্য আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিত দিতো। রাতে ঘুমানোর আগে দাদুর বলা গল্প আর চাদের রুপালী রঙ আমাদের স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যেত। আহা কি সোনালী সময়! 

মলাঃ আমি তবুও খেলা ধূলায় ভালো ছিলাম, তোর তো সেই খায়েশ টুকুও ছিলো না, সারাক্ষন তো ভয় ভয়েই থাকতি। আমি ঘুড়ি উড়াতাম বিকেলে আর তুই ফড়িং ধরার ফাদ পেতে বসে থাকতি। তুই বড্ডই কম রসবান ছিলি।

ঢেলাঃ হা হা!

মলাঃ তবে সেই সোনালী অতীত ভুলে আমি এখন ৫৮ বয়সের  বুড়ো, সেই জীবন ও শৈশবকে আমি আজও খুজে বেড়াই। তবে এই যান্ত্রিক শহর সেগুলোকে খুজতে বাধা দেয়, সেগুলোকে যেন এই শহর পিষে মেরে ফেলেছে, কি ভয়ংকয় শহর।

ঢেলাঃ আমার চাদের শহর টা এই যান্ত্রিক শহরের কারনে আজ মৃত প্রায়। আমাদের ছোট ছেলে, মেয়ে, নাতিনাতনীরা আজ যান্ত্রিকতার মাঝে লিপ্ত, তারা কি বুঝে শিশিরে ভেজা ঘাসে ছোয়ার আনন্দ, তারা কি বুঝে পুকুরে মাছ ধরার আনন্দ, তারা কি সুন্দর শৈশব হারাচ্ছে না? এসবের জন্যে দায়ী কে?

মলাঃ আমরাই তো সব ধ্বংস করছি, এই যে গাছ পালা কেটে, মাঠ উজার করে বিল্ডিং ভবন বানাচ্ছি, পুকুর ভরাট করে দালান বানাচ্ছি। তাহলে শৈশব জীবনটা কিভাবে বাচ্চারা উপভোগ করবে। আমাদের শহুরে জীবন ধারার চেয়ে সেই মলা ঢেলার শৈশব জীবন কতই না সোনালী ছিল, ঠিক চাঁদের মত সুন্দর।

ঢেলাঃ চল ভাই আমরা আজ উঠি, দোকানী দোকান টা বন্ধ করে দেবে, প্রচুর শীত।

মলাঃ চশমা টা পাচ্ছিনা যে, ঢেলা একটু খুজে দে। 

ঢেলাঃ সেটা তো তোর হাতেই দেখতে পারছি, এজন্যেই বুঝি মাস্টমশাই বলেছিলো মলা ঢেলা মাছের তরকারি খেতেহাহা হাহা!

মলাঃ হা হা হা হা!

সারাংশঃ ছোট এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক তবে আমাদের সোনালী শৈশবের কাটানো জীবন ধারাটা তুলে ধরার প্রচেষ্টা গল্পটিতে রয়েছে। হাস্যরসাত্মক ভাবে মলা ঢেলা চরিত্রকে ফুটিয়ে তাদের শৈশবের জীবন ধারা লেখক গল্পের মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা করেছে। পরিশেষে শহুরে যান্ত্রিকতার বিষাক্ত শক্তিতে সোনালী শৈশব হারিয়ে যাওয়ার ক্রোধ লেখক দেখিয়েছেন এবং সবাইকে সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন।

আরোও ব্লগ পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

 

লেখক

মোঃ রায়হান কবীর

ইন্টার্ন, কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE