YSSE কতৃক আয়োজিত “Behind the Journey” শো এর মূল উদ্দেশ্য সামাজিক উদ্যোক্তা ও নেতাদের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও উন্নতি থেকে তরুণদের অনুপ্রাণিত করা। এরই ধারাবাহিকতায় এবার “Behind the Journey” সিজন ০২ এর ১২তম পর্বে সফলতার গল্প শোনাতে যুক্ত হয়েছেন জি এম কামরুল হাসান স্যার, CEO -AKIJ Infotech, AKIJ BPL Limited & AKIJ Telecom, যিনি একাধারে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে নিজের সফলতার সাক্ষর রেখেছেন। তিনি ২০১৭ সালে World HRD Congress কতৃক “Business Excellence Award as Best CEO from South Asian Partnership Summit 2017” অর্জন করেন এবং সেই সাথে ২০১৯ সালে Asian One কতৃক “World’s Greatest CEO 2018-2019” পুরস্কারেও ভূষিত হন। কর্পোরেট নেতৃত্বে তার দীর্ঘ ২৯ বছরের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা অনেক পেশাজীবীকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি একজন কর্পোরেট কোচ এবং পথপ্রদর্শক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়। তার এই দীর্ঘ পথচলার গল্প শুনব আজকের এই পর্বে।

প্রশ্ন ১: দীর্ঘ ২৯ বছরের কর্পোরেট জীবনে আপনি Nestlé, Rahimafrooz, New Zealand Dairy সহ অসংখ্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে CEO হিসেবে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনের একটি সংক্ষিপ্ত  অভিজ্ঞতা ও কী কী চ্যালেঞ্জ এর সম্মুখীন হতে হয়েছিল যদি একটু শেয়ার করতেন।

উত্তর: আমি আমার কর্মজীবন ১৯৯৫ সালে শুরু করি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ২৯ বছর ৫ মাস সতঃস্ফুর্তভাবে কাজ করে চলেছি আলহামদুলিল্লাহ্। আমার কর্মজীবনের শুরুটা বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি Nestlé থেকে। Nestlé তে সেলস্ এন্ড ব্র‍্যান্ড মার্কেটিং এ ১২ বছর চাকরি করে আমি শিফট্ করি Rahimafrooz এ। ওখানে হেড অফ মার্কেটিং হিসেবে ১ বছর দায়িত্ব পালন পরে আমি যুক্ত হই New Zealand Dairy তে। New Zealand Dairy তে ৫ বছর চাকরি করে আমি শিফট্ হই Fonterra তে Country Head হিসেবে। Fonterra Singapore এ ১.৫ বছর চাকরি করে আমি যুক্ত হই Pran Food and Beverage এ গ্রুপ মার্কেটিং হেড হিসেবে। ওখানে কিছু বছর কর্মরত থেকে আমি গ্রুপ CEO হিসেবে যুক্ত হই IGLOO Ice Cream,Food, Dairy, Sugar কোম্পানিতে। IGLOO তে ৫ বছর কর্মরত থেকে যুক্ত হই একটি রিটেইল এন্ড বি টু বি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম Sindabad.com এ। এখানে আমি ৩ বছরের মত চাকরি করেছি। তারপর ২ বছরের মত চাকরি করেছি অস্ট্রেলিয়ার একটি এডটেক কোম্পানি NEXTGEN Global এ। এবং বর্তমানে ৩ মাস হলো আমি কর্মরত আছি  AKIJ গ্রুপের ৩ টা ডিপার্ট্মেন্টের এর CEO হিসেবে।

আর চ্যালেঞ্জ এর প্রসঙ্গে বলব, আমি আমার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও নিওট্রিশন বিভাগ থেকে। বায়োকেমিস্ট্রি তে পড়াশুনা করে সেলস্ এন্ড মার্কেটিং এ কাজ করা অবশ্যই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো। যেমন এন্ট্রি লেভেল থেকে সিনিয়র, সেখান থেকে মিড লেভেল ম্যানেজার, তারপর মার্কেটিং হেড, সি এম ও, কান্ট্রি হেড, সি ই ও, সব ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু চ্যালেঞ্জ ছিলো। আমার দৃষ্টিভঙ্গি বলে ক্যারিয়ারের প্রত্যেকটি ধাপে চ্যালেঞ্জ লুকায়িত।  কিন্তু আমি সবসময় চ্যালেঞ্জ কে নতুন কোনকিছু শেখার ও নিজের স্কিল বৃদ্ধি করার সুযোগ হিসেবে মনে করি। এভাবেই আমি আমার কর্মক্ষেত্রে পরিশ্রম, বুদ্ধি ও নতুন কিছু শেখার মানসিকতার দিয়েই বিভিন্ন প্রতিকুলতা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। দীর্ঘ এই কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনই আমি নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে,  নিজের দক্ষতাকে সুযোগে রুপান্তর করার মাধ্যমে আরও বেশি সমৃদ্ধ হচ্ছি। এবং আল্লাহ্ আমাকে সুস্থ রাখলে আরও ১০-১৫ বছর কাজ করার সুযোগ আছে আমার।

প্রশ্ন ২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড নিউট্রিশন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে মার্কেটিং এন্ড ম্যানেজমেন্টে ক্যারিয়ার গড়ার ট্রান্সফরমেশনটা আসলে কিভাবে হলো?

উত্তর: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই আমি খুব পরিশ্রমী ছিলাম। কখনও টিউশনি করিয়েছি, কখনও আবার পার্ট টাইম চাকরি করেছি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলাম বলে কিছু একটা শুরু করার তাগিদ খুব কাজ করত। তাই মাস্টার্স এর পরে এবং থিসিসের আগে আমি Nestlé তে জয়েন করি। তারপর কাজ করতে করতে বুঝলাম এই কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে আমার প্রয়োজন সাধারণ জ্ঞান, পারসনাল ব্র‍্যান্ডিং ও কানেক্টিভিটি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে আমার অনেক কানেক্টিভিটি তৈরি হয় যা পরবর্তীতে আমাকে অনেক সাহায্য করে। এরপর এই ফিল্ডে কিছু বছর চাকরি করার পর নিজের অভিজ্ঞতা বিক্রি করতে শুরু করি। এবং আস্তে আস্তে এই ফিল্ডে সমৃদ্ধ হওয়া শুরু করি। এভাবেই প্রয়োজন অথবা তাগিদ থেকে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমার যাত্রা রুপান্তরিত হয়।

প্রশ্ন ৩: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চকর্মকর্তা হিসেবে কাজের সুবাদে আপনাকে অনেক টিম ম্যানেজ করতে হয়েছে। টিম ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কিছু টিপস্ ও অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করতেন।

উত্তর: টিম ম্যানেজমেন্ট একটি মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্কিল। ম্যানেজেরিয়াল স্কিল এবং লিডারশীপ স্কিলের সমন্বয়ে এই স্কিল। টিম চালাতে গেলে প্রথমত যে জিনিসটা লাগে তা হলো আপনার টিমের সদস্যদের দু:খ, ব্যথা এবং কী পন্থা অবলম্বন করলে তারা ভালো করতে পারবে সেই সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা। এবং সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন হয় তা হলো ধৈর্য। এছাড়াও প্রয়োজন পর্যবেক্ষন ক্ষমতা ও মানুষের কথা শোনার মানসিকতা।

প্রশ্ন ৪: আপনার ট্রেইনিং এন্ড কন্সাল্টেন্সি ফার্ম “কর্পোরেট কোচ” কীভাবে কাজ করে এবং তরুণরা এখান থেকে কীভাবে উপকৃত হতে পারে?

উত্তর: আমার এই পেজ দুটো খোলার মূল অনুপ্রেরণা হচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ক্যারিয়ার গড়তে ও স্কিল বৃদ্ধি করতে সাহায্য করা। এখানে সবমিলিয়ে আমার ৭০-৮০ হাজার ফলোয়ারস আছে এবং লিনকড্ইনে ৩০ হাজার এর মত কানেকশন্স আছে। আমি অনলাইনে প্র‍্যাক্টিকাল ট্রেইনিং সেশন নেই ব্র‍্যান্ড মার্কেটিং, সেলস মার্কেটিং, লিডারশীপ স্কিল ইত্যাদি এর উপর। এবং এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমি খুব কম চার্জ নেই কারন আমি মনে করি যেহেতু আমি এই সমাজে বড় হয়েছি, আমারও সমাজের প্রতি কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

Audience Q/A:

১। বুয়েটের ভর্তি বাতিল করে ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পিছনের গল্পটা কী  ছিল?

উত্তর: ১৯৮৮ সালে এক বছরের বেশি সময় ধরে একটি সেশন জট ছিল। ওই সময় শখের বসে এবং বড় ক্যাম্পাসের টানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেই এবং চান্স পাই। আসলে প্রত্যেকটা মানুষের রিজিক আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত। আমার রিজিকেও এটাই লিখা ছিল।

২। Nestlé তে চাকরি শুরু করার আগে ট্রেনিং পিরিয়ড থেকে বাদ পড়ার কারণ কী ছিলো এবং পরবর্তীতে কীভাবে আবার চাকরি অফার পেয়েছিলেন?

উত্তর: Nestlé তে ইন্টেরভিউ দেয়ার পরে ট্রেনিং পিরিয়ডে তারা আমাকে একটি ১৫শ টাকার খাম ধরিয়ে দিয়ে বলে আমি তাদের স্ট্যান্ডার্ড ফিলাপ করতে পারিনি, যেটা আমার জন্য খুবই হতাশাজনক ছিল। পরে যদিও আমি Nestlé Switzerland এ নালিশ পাঠাই তাদের নামে, যে Nestlé এর মতো একটি সনামধন্য কোম্পানির এরকম কমিট্মেন্টের সাথে আপোষ করা মানায় না। এবং পরবর্তীতে ৬ মাস পরে রিইন্টারভিউ নেয়া হয় Nestlé থেকে এবং আমি আবার জয়েন করি।

৩। Nestlé তে Brand Manager হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তাকে কেন MBA সম্পন্ন করার শর্ত দেয়া হয়েছিলো?

উত্তর: Nestlé তে কর্মরত থাকা অবস্থায় যেহেতু আমার MBA সম্পন্ন করা ছিল না, সেহেতু আমাকে নানান কতুক্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু কোন কটু মন্তব্যই আমার এগিয়ে যাওয়ার পথে বাঁধা হতে পারেনি। আমি পরবর্তীতে East West University থেকে MBA সম্পন্ন করি।

৪। New Zealand Dairy তে জয়েন করার আগে আপনার কাছে দু’টো কোম্পানির অফার লেটার এসেছিল। যার মধ্যে New Zealand Dairy আপনাকে কম বেনিফিট অফার করা স্বত্তেও এই কোম্পানি বেছে নেয়ার অনুপ্রেরণাটা আসলে কী ছিল?

উত্তর: আমি মনে করি প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজের শক্তি ও দুর্বলতা সম্মন্ধে সচ্ছ ধারনা থাকা উচিত। তো যখন আমার কাছে দু’টো অফার লেটার আসে  যেখানে একটার বেনিফিট বেশি ও অন্যটার কম, তখন আমার মনে হয়েছে, যে কর্মক্ষেত্রে আমি অবদান বেশি রাখতে পারব এবং আমার সক্ষমতার প্রতিফলন যেখানে বেশি থাকবে আমার সেখানেই যোগদান করা উচিত। কারন আমি মনে করি অর্থই সবকিছু নয়, বরং সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করাই আসল বেনেফিট। এবং এই জন্যই আমি আমার কম্ফোর্ট জোন কে বেছে নিয়েছিলাম। যদিও পরবর্তীতে ম্যানেজমেন্ট থেকেই তাদের মনে হয়েছিল আমাকে ঠকানো হচ্ছে এবং তারা পরে বিষয়টা বিবেচনায় এনেছিল। তারপর অনেক বছরই ওখানে কাজ করেছি। এখনও যখন ওই কোম্পানিতে নিজের অবদানের কথা মনে করি তখন খুব গর্ববোধ হয়।

তরুণ প্রজন্ম যারা আছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার উপদেশ থাকবে আপনারা টাকার পিছনে না ছুটে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে কাজ করুন। ভালো একটি অরগানাইজেশানে কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনার ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তাই যত বেশি পারবেন নিজের স্কিল বৃদ্ধি ও শেখার পিছনে ইনভেস্ট করবেন।

তরুণদের উদ্দেশ্য কিছু কথা:

বাংলাদেশ অনেক সম্ভাবনাময় একটি দেশ। এই সম্ভাবনা কে পুঁজি করতে আপনার প্রয়োজন কিছু ভালো বন্ধু যারা আপনার জীবনে ভালো কোন অবদান রাখতে সক্ষম। এছাড়া প্রতিনিয়ত নিজের স্কিল বৃদ্ধি করুন এবং কিছু নতুন শেখার চেষ্টা করুন। এভাবে আপনার আত্মবিশ্বাস আরও মজবুত হবে।

সফলতার পথ কখনও সহজ হয় না। সফলতার জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম ও হার না মানার দৃঢ় সংকল্প, যা আমরা আজকে উপলব্ধি করেছি কামরুল হাসান স্যারের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে। আমরা স্যার এর দেখানো পথে হেঁটে নিজেদের ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করব।

ধন্যবাদ সবাইকে।

এরকম আরো ব্লগ পড়তে, এখানে ক্লিক করুন

লেখিকা

খোশবুবা আলম ব্রতী

ইন্টার্ন, কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE