বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওাত হোসেনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তার লেখা উপন্যাস ‘সুলতানা’স ড্রিম’ বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ ইউনেস্কোর ‘বিশ্বস্মৃতি’ তালিকায় স্থান পেয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ অর্জন। মঙ্গোলিয়ার উলান বাটোরে অনুষ্ঠিত মৌক্যাপের দশম সাধারণ সভায় এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক সাহিত্য ও নারীবাদী চিন্তাধারার ক্ষেত্রেও এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
“সুলতানার স্বপ্ন”- এর যাত্রা
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নারী স্বাধীনতার স্বপ্নঘেরা কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক এই রচনা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে মাদ্রাজের দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিনে। পরে, ১৯০৮ সালে এটি কলকাতার এস কে লাহিড়ী অ্যান্ড সন্স থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক রচনার একটি কপি সংরক্ষিত রয়েছে দিল্লির প্রাইম মিনিস্টার মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে এর ডিজিটাল সংস্করণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে উপহার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, রোকেয়া পরিবারের উত্তরসূরি মাজেদা সাবের মূল বইয়ের একটি প্রতিলিপি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে হস্তান্তর করেছেন।
এছাড়াও, এই রচনার একটি কপি ব্রিটিশ লাইব্রেরির দক্ষিণ এশিয়া বিভাগেও সংরক্ষিত রয়েছে। রোকেয়ার কাজের প্রভাবকে তুলে ধরতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য ইউনেসকোর নির্বাচন কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। এই স্বীকৃতির তালিকায় ১৯৮০ সালে মঞ্চস্থ ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নাটক এবং ২০২৩ সালে স্পেনের নারী পরিচালক মিগেল হার্নান্দেজের নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা রোকেয়ার সৃষ্টির বৈশ্বিক গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
‘সুলতানার স্বপ্ন’ ও নারীবাদী আন্দোলন
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন শত বছর আগে এই স্বল্পদৈর্ঘ্য উপন্যাসটি লিখে নারীদের জন্য এক স্বপ্নের সমাজ কল্পনা করেছিলেন, যেখানে নারীরা সমাজের যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি আর পুরুষেরা প্রায় গৃহবন্দী। তার এই রচনা নারীবাদী আন্দোলনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়, যা নারীদের মুক্তি ও ক্ষমতায়নের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে সুস্পষ্ট করে।
এই উপন্যাসে বর্ণিত “নারীস্থান” বা নারীদের দ্বারা পরিচালিত এক সমাজ ব্যবস্থা শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং এটি এক শক্তিশালী সামাজিক সমালোচনাও। রোকেয়ার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বিশ্বে নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গে আজও প্রাসঙ্গিক।
ইউনেস্কোর বিশ্বস্মৃতি তালিকায় অন্তর্ভুক্তি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নথি ও সাহিত্যকর্মকে সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কো একটি বিশেষ তালিকা রয়েছে, যাকে ‘বিশ্বস্মৃতি’ বা ‘ওয়ার্ল্ড মেমোরি’ তালিকা বলা হয়। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানে একটি গ্রন্থের সার্বজনীন গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক মূল্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া।
সুলতানার স্বপ্ন উপন্যাসটি তার গভীর নারীবাদী বার্তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য অবদানের কারণে ইউনেস্কোর এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। এই উপন্যাসটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। এটি শুধু বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছেই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা
এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নতুন প্রজন্মের লেখক, গবেষক এবং সামাজিক কর্মীরা রোকেয়ার কাজ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারবেন এবং তার চিন্তাধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি গবেষণা, আলোচনা এবং নতুন ভাষায় অনুবাদের সুযোগ তৈরি হবে। এই স্বীকৃতি শুধু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশ এবং নারীর ক্ষমতায়ন আন্দোলনের জন্য এক বিশাল অর্জন।
‘সুলতানার স্বপ্ন’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী উপন্যাস। শুধু প্রথম বললেও ভুল হবে, এটাই অন্যতম ও সেরা কাজ। এমন পরিপূর্ণভাবে নারীদের অধিকার নিয়ে কেউ বলেনি। ইউনেস্কোর ‘বিশ্বস্মৃতি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তার সাহিত্যিক ও সামাজিক অবদান নতুন মাত্রা পেল। এটি নারীদের অগ্রগতি ও সামাজিক সাম্যের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নারীবাদী সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলা ভাষার নারীবাদী চেতনার বিকাশে এটি এক চিরস্মরণীয় সৃষ্টি। এই স্বীকৃতি শুধুমাত্র একটিমাত্র রচনার গৌরব নয়, বরং সমগ্র নারী সমাজের জন্য এক সম্মান।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে, এখানে ক্লিক করুন
লেখিকা
খোশবুবা আলম ব্রতী
ইন্টার্ণ, কনটেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
