বাংলাদেশের জাতীয় বন সুন্দরবন। সুন্দরবন যার অপর নাম বাদাবন বা গরানবন যেটি বর্তমানে একটি অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে আখ্যায়িত, এবং হাজার হাজার পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। মৌসুমি বায়ুতে এবং বসন্তের আগমনে প্রকৃতি প্রেমীরা ছুটে যায় সুন্দরবনের কোল পাণে।  

অবস্থান – গঙ্গা ও মেঘনা নদীর তীর, বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। এর নিকটবর্তী শহর-খুলনা, কলকাতা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কাকদ্বীপ ও ক্যানিং। স্থানাঙ্ক :-২১°৫৭` উত্তর, ৮৯°০৫` পূর্ব। আয়তন:-১,৩৯,৫০০ হেক্টর (৩,৪৫,০০০ একর)।

আমরা জানি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি বাংলাদেশ। চোখ জুড়ানো, নজরকাড়া বৈচিত্র্যময় সব সৌন্দর্য যেন সৃষ্টিকর্তার অকৃপণ আর্শীবাদের এক নমুনা। প্রাকৃতিক এই পরিবেশ যেমন বাড়ায় সৌন্দর্য তেমনি আমাদেরকে এবং এই পরিবেশকে সুরক্ষা করছে   প্রাকৃতিক বিপর্যের হাত থেকে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় ‘সুন্দরী গাছ’ থেকেই সুন্দরবনের জন্ম। ভৌগোলিক গঠন, জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদবৈচিত্র্য, জীবমণ্ডল এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে, দুঃখজনক হলেও সত্যি মনুষ্যঘটিত নানা স্বার্থান্বেষী কর্মকান্ডের জন্য প্রতিনিয়ত ধ্বংসের পথে যাচ্ছে এই অপরূপ সুন্দরবন এবং এর আকর্ষণ। যা রক্ষার্থে   প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি  সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করা জরুরি। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিস্ময়ের এক অপরূপ লীলাভূমি। 

আসা যাক প্রাণীবৈচিত্রের কথায়। প্রথমত বলতে হয় বাঘ (রয়েল বেঙ্গল টাইগার) এর কথা। ২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে, সুন্দরবনের বাঘ সংখ্যা ৫০০। মানুষের নানা বেআইনী কাজ, আত্মরক্ষা এবং অভয়ারণ্য না থাকায় বর্তমানে যার সংখ্যা মাত্র ১৬৪।

সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান মৌলিক প্রকৃতির, যা বন্য প্রাণীর বিশাল আবসস্থল। বন্য প্রাণীর সংখ্যা এবং এর লালনক্ষেত্রের উপর মানুষের সম্পদ সংগ্রহ ও বন ব্যবস্থাপনার প্রভাব অনেক। কচ্ছপ, সুন্দি কাছিম, গিরগিটি, গুইসাপ, অজগর সুন্দরবনের প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, মহিষ, জাভাদেশীয় গন্ডার, সাদুপানির কুমিরের মত কিছু কিছু প্রজাতি সুন্দরবনে বিরল হয়ে উঠেছে ২১ শতকের শুরু থেকে। 

সুন্দরবনে মৎস্যসম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একভাগ হলো সাদা মাছ, অন্যভাগ হলো বাগদা, গলদা, কাঁকড়া ইত্যাদি। 

ধারণা করা হয় সুন্দরবনে ৩০০ প্রজাতির শিরদাঁড়ওয়ালা মাছ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কখনো গবেষণা করা হয়নি ফলে সংখ্যা অনুমান ব্যতীত অন্য কিছু সেভাবে বলা সম্ভব নয়। 

সুন্দরবনের উদ্ভিদ বৈচিত্র্যর মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। এখানে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী, গেওয়া, ঝামটি, গরান এবং কেওড়া গাছ জন্মে। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত প্রেইনের হিসেব মতে সর্বমোট ২৪৫টি শ্রেণী এবং ৩৩৪টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। 

এমনকি অন্য বনাঞ্চলের উদ্ভিদের জীবনচক্রের সাথেও রয়েছে এখানকার উদ্ভিদের পার্থক্য। পার্থক্যের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় বিশুদ্ধ পানি ও নিম্ন লবণাক্ততা, পানি নিষ্কাশন ও পলি সঞ্চয়ের প্রভাব।

নানা আঙ্গিকের জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদবৈচিত্র্য, ভৌগলিক গঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব কারণেই সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে অনেক। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে যেমন, ঠিক তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি দেশের বনজ সম্পদের বৃহত্তম উৎস। এই বন কাঠের উপর নির্ভরশীল শিল্পে কাঁচামালের জোগান দেয়। 

এছাড়াও কাঠ, জ্বালানি ও মন্ডের মতো প্রথাগত বনজ সম্পদের পাশাপাশি এ বন থেকে নিয়মিত ব্যাপকভাবে আহরণ করা হয় ঘর ছাওয়ার পাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া এবং শামুক-ঝিনুক। বৃক্ষপূর্ণ সুন্দরবনের এই ভূমি একই সাথে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী, শক্তি সম্পদের আধার এবং পর্যটন কেন্দ্র।

বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশজুড়ে সুন্দরবন, বন থেকে আসা মোট আয় প্রায় ৪১ শতাংশ এবং কাঠ ও জ্বালানি উৎপাদনে অবদান প্রায় ৪৫ শতাংশ (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, ১৯৯৫)। অনেক শিল্প (যেমন- নিউজপ্রিন্ট, দিয়াশলাই, হার্ডবোর্ড, নৌকা, আসবাবপত্র) সুন্দরবন থেকে আহরিত কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল।

এছাড়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধে সুন্দরবন অদ্বিতীয় ভূমিকা পালন করে। আক্ষরিক ভাষায় সুন্দরবনকে তাই ‘ন্যাচারাল প্রোটেকটর গিফটেড বাই গড’ হিসাবে অভিহিত করাই শ্রেয়। সিডর, আইলা, আম্ফান, নার্গিসের মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের সময় নিজ বুকে আঘাত নিয়ে আমাদের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে সুন্দরবন।

সুন্দরবনের যে অসীম সম্পদ রয়েছে, তা সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে অবৈধভাবে ব্যবহার করতে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এমনকি মধু বা গোলপাতা সংগ্রহকারী কিংবা জেলেদের অপহরণের মাধ্যমে  বনজ সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করে বিভিন্ন বনদস্যুরা। 

ইদানিং এসব বনদস্যুদের আত্মসমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালে “মাস্টার” বাহিনী নামে সুন্দরবনের সবচাইতে বড় বনদস্যু বাহিনী বাংলাদেশের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। সেখান থেকেই শুরু, তখন তারা তাদের আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয় এবং পুনর্বাসনে রাজি হয়।

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা তাদের পুনবার্সনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এসব দৃশ্যপটের যত বেশি পুনরাবৃত্তি ঘটানো যায়, ততই মঙ্গল। এছাড়াও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার যে প্রজোক্ট ছিলো তা ব্যাহত হওয়ায় সেবার সুন্দরবন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।

সুন্দরবন গবেষণার বড় একটি ক্ষেত্র। যদিও সুন্দরবন কেন্দ্রিক বড় কোনো গবেষণাকারীর কাজ চোখে পড়ে না। তবে, এ ব্যাপারে সচেতনতা খুবই জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষত বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়  এটি পুরো বিশ্বের সম্পদ। 

সুন্দরবনকে বিপর্যের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের নিতে হবে প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ।

  • প্রাণিদের বাঁচাতে হবে জলদস্যুর হাত থেকে।
  • নোনা পানির লবণাক্ত যাতে বেড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • ভারতের অংশ হতে বাংলাদেশের সুন্দরবনের অংশের পানি খুব বেশি লবণাক্ত নয়। যার কারণে এতো সুন্দরী গাছ, গেওড়া সহ নানা গাছ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে অচিরে। তাই এই জীববৈচিত্র্য  রক্ষা খুবি জরুরি।
  • মাটির উর্বরতা যাতে কমে না যায় বন বিভাগের সেদিকে দৃষ্টি রাখা অতিব জরুরি।
  • বিলুপ্ত প্রাণীর হার যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে  সচেতন হতে হবে আমাদের সকলকে।
  • পর্যটনকেন্দ্র কে রক্ষা করার দ্বায়িত্ব  আমাদের পর্যটকদের। তাই সুন্দরবনের মত এই বিরাট পর্যটনকেন্দ্রকে যত্রতত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • ভিন্ন নিয়ম বেধে অর্থাৎ পর্যটনকেন্দ্র ব্যবহারের সঠিক নিয়ম মেনে  এই পর্যটনকেন্দ্র ব্যবহার করে পর্যটনশিল্পকে বাচিঁয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

“যেতে দিও না মরে, বাচঁতে আমি চায়।

তোমাদের দিয়ে যাবো সৌন্দর্যের আধার ~সবুজের সমরাই।”

সুন্দরবনের আহাজারি সকলের কাছে।

এরকম আরো ব্লগ পড়তে, ক্লিক করুন। 

লেখিকা

মোরশেদা বেগম

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE