কেউ যখন আপনার সামনে উচ্চ শব্দে আওয়াজ করে খাবার চিবিয়ে খায় তখন কি তার প্রতি আপনার মনে প্রবল বিতৃষ্ণা আসে? অথবা ব্ল্যাকবোর্ডে চকের ঘর্ষণের আওয়াজ,মাটিতে জুতো দিয়ে করা আওয়াজ,হাড়িপাতিলে চামচ ঘর্ষণের আওয়াজ আপনার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আপনার মনে ও শরীরে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে? তাহলে জেনে নিন, আপনি মিসোফোনিয়া তে আক্রান্ত। কী এই মিসোফোনিয়া?
নির্দিষ্ট কিছু শব্দের প্রতি প্রবলভাবে ঘৃণা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি, শরীর গুলিয়ে উঠার এই আচরণকে মূলত মিসোফোনিয়া বলে।
কেউ মিসোফোনিয়ার সাথে হাইপারঅ্যাকিউসিসকে (Hyperacusis) গুলিয়ে ফেলবেন না। আসলে তীব্র মাত্রার আওয়াজে শরীরের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনকে হাইপারঅ্যাকিউসিস বলে; যেমন- গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ণ, উচ্চস্বরের মাইক বা সাউন্ড বক্সের আওয়াজে সৃষ্ট সমস্যা। মিসোফোনিয়া হলো সুনির্দিষ্ট এক বা একাধিক আওয়াজের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হওয়া। এটি মূলত একপ্রকার স্নায়বিক সমস্যা যা মূলত দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে মিসো অর্থ ঘৃণা এবং ফোনিয়া অর্থ কণ্ঠ বা ধ্বনি।
এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কণ্ঠস্বর বা শব্দের কারণে রাগ এবং নার্ভাস হতে শুরু করেন। যে ব্যক্তির মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিকতা আছে তার মস্তিষ্ক এই ধরনের শব্দ দ্রুত ক্যাচ করে নেয় এবং তারপরে তার ফোকাস সেখানেই থাকে। কিছু রোগীর অবস্থা এতটাই গুরুতর যে এই ধরনের শব্দ শুনে তারা মেজাজ হারিয়ে ফেলেন, এমনকি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
যে কোনো বয়সের মানুষই মিসোফোনিয়ায় ভুগতে পারেন। একজন ৬ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত, যে কেউ এই রোগের শিকার হতে পারে।মিসোফোনিয়ার সমস্যায় ভুক্তভোগী সকলেই প্রায় নির্দিষ্ট কিছু শব্দে অসুবিধা অনুভব করে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, খাবার খাওয়ার শব্দ, নাক ডাকার শব্দ, টাইপ করার শব্দ, কলম টোকা দেওয়ার শব্দ, বাসন ঠেকানোর শব্দ, শিস বাজানো ইত্যাদি। এইসব বিশেষ শব্দের প্রতি তারা সবসময় বিরক্তি প্রকাশ করে।
মূলত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কানে যখন তাদের অপ্রিয় কোনো উত্তেজিত শব্দ পৌঁছে তখন তাদের মস্তিষ্কে একধরণের জটলা বেঁধে যায়। ঠিক কী কারণে এমন টা হয় তা আজ অব্দি জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, এই রোগটি আংশিক শারীরিক এবং আংশিক মানসিক। কেননা,উত্তেজিত শব্দ গুলো এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে ফেলে এবং তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
যদি অতি সাধারণ আওয়াজ যা অন্যান্য মানুষ লক্ষ্যই করে না, কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে উত্তেজনা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় বুঝে নিবেন আপনি এই সমস্যায় ভুগছেন। একটি মাত্র আওয়াজের প্রতি অস্বস্তি থেকে মিসোফোনিয়া শুরু হতে পারে এবং পরবর্তীতে আরও অনেক ধরনের আওয়াজ এই তালিকায় যোগ হতে পারে।
এবার চলুন,জানা যাক, মিসোফোনিয়ার লক্ষণ গুলো কী কী-
কোনো মিসোফোনিক ব্যক্তি যদি হুট করে কোনো অপ্রিয় উত্তেজনামূলক শব্দ শুনে তবে তৎক্ষনাৎ তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়,প্রচুর ঘাম নির্গত হতে থাকে। মূলত ওই ব্যক্তির মস্তিষ্ক তখন ভাবতে থাকে এই বুঝি সে বিপদে পড়লো। আর এভাবেই মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া টি সৃষ্টি করে।
অনেক সময় তীব্র উত্তেজনায় এরা অন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেও পারে! এই বিষয়টির পেছনে কাজ করে কোনো অতীত স্মৃতি, মানসিক অস্বস্তি বা কোনো ভয়।
কোনো সামাজিক জমায়েতে স্বস্তিদায়ক অবস্থান খুঁজে পেতে এদের সমস্যা হয় এবং এরা নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে।
কর্মস্থলে নিজের পারিপার্শ্বিকতার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারা এদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে।
পাশে কেউ খাবার খাওয়ার সময় শব্দ করলে অস্বস্তি বোধ করে। কারো কারো প্যানিক অ্যাটাকও এসে যায়।
এসবের কারণে মিসোফোনিক ব্যক্তিদের মধ্যে ভর করে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা। একটা সময় পরে গিয়ে এরা হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ।
তাই আমাদের উচিত নিজে অথবা আমাদের আশেপাশের কেউ এধরণের সমস্যার সম্মুখীন হলে তাকে সাহায্য করা। কেননা,মিসোফোনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। হতে পারে ডাক্তার কিছু থেরাপির মাধ্যমে উক্ত রোগীকে তার রোগের সঙ্গে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করতে পারেন। এক্ষেত্রে কানে কিছু হেয়ারিং এইড লাগানো যেতে পারে যেন বিরক্তিকর আওয়াজ গুলো থেকে মনযোগ সরে যায়।
এসবকিছুর পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কসরৎ ও পরিমিত ঘুমের দ্বারা দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস চালাতে হবে। মিসোফোনিয়া এমন একটি সমস্যা যেখানে শরীর ও মন উভয়ই জড়িত। তাই উভয়ের অনুশীলনের মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। এটা হয়তো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। মনে রাখবেন,যেকোনো পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।
এরকম আরো কন্টেন্ট পড়তে ক্লিক করুন.
লেখিকা,
মৌসুমী আক্তার রিতু
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
