১৯৭১ সাল।  বাঙালি ও পাকবাহিনীর যুদ্ধ চলছে তখন। বর্বর পাকবাহিনী যখন নির্বিচারে বাঙালি হত্যা, বাড়িঘর লুট, মা বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করতে উদ্ধত হয়েছিল তখন কিন্তু বাঙালিরা থেমে থাকে নাই। শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, পাকবাহিনীকে দমন করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিল তারা। ভয়ংকর সে যুদ্ধে পুরুষদের সাথে সামিল হয়েছিল নারী ও কিশোরীরাও। ১১ নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন তেমনি একজন মানুষ, তিনি হলেন তারামন বিবি। তারা সাহসিকতা, বীরত্ব আর বিচক্ষণতার কারণে বারবার ঘায়েল হতে হয়েছিল পাক বাহিনীকে। তারামন বিবির বীরত্ব গাঁথা সেসব গল্প গুলোই আজ জানব আমরা।

ব্যক্তিগত জীবন 

তারামন বিবির প্রকৃত নাম মোছাম্মৎ তারামন বেগম১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে তারামন বিবির জন্ম হয়। তার বাবার নাম আবদুস সোহবান এবং মায়ের নাম কুলসুম বিবিমুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। যুদ্ধ চলাকালে কুড়িগ্রাম ছিলো ১১ নাম্বার সেক্টরের অধীনে। তারামন বিবি ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের পরপরই তার বিয়ে হয় আবদুল মজিদের সাথে। এই দম্পতির দুটি সন্তান আছে। মজার ব্যাপার হলো আবদুল মজিদ ১৯৯৫ সালের আগে জানতেন না তারামন বিবি একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। 

 

যুদ্ধে তারামন বিবি অবদান

ছোটবেলায় তারামন বিবির নাম ছিলো তারা। ছোট্ট তারা একদিন দেখলেন গ্রামে পাক বাহিনীর সৈন্য প্রবেশ করছে, তিনি বুঝলেন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের সময় তারাদের গ্রামের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প তৈরি করা হয়। ক্যম্পে রান্নাবান্না, ধোয়া মছার জন্য একটি মেয়ের প্রয়োজন ছিল। ক্যাম্পের হাবিলদার মুহিব তালুকদার তারাকে  ক্যাম্পে নিয়ে আসতে চাইলে। কিন্তু তারার মা শুরুতে রাজি হননি। মুহিব তালুকদার তারাকে ধর্মমেয়ে করার পরে তারার মা তাকে ক্যাম্পে পাঠাতে রাজি হন । মুহিব তালুকদার তারার নাম দেন তারামন। ক্যাম্পে তিনিই ছিলেন সবার ছোট। রান্নার কাজের পাশাপাশি যুদ্ধকৌশলও শেখানো হয় তারামনকে। পরে তাঁর সাহস ও শক্তি দেখে মুহিব হাবিলদার তাঁকে অস্ত্র চালনা শেখান। অন্যান্য পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেও তারামন যুদ্ধের কৌশল শিখতেন।

 

একদিন দুপুর বেলা। ক্যাম্পের যুদ্ধারা বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। সেসময় তারামন একটি গাছে উঠে চারপাশে নজর রাখছিলেন। তখন তিনি দেখতে পান দূরে একটি পাকবাহিনীর দল ক্যাম্পের দিকে আসার চেষ্টা করছে। তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে তারামন ক্যাম্পের সবাইকে সতর্ক করে দেয়। খাবার রেখেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত হয়ে যান যুদ্ধের জন্য। সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ হয় সেদিন। সে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারাই বিজয় অর্জন করে, তবে এ অর্জন মূলত তারামন বিবির।

সম্মুখ যুদ্ধেও পারদর্শী ছিলেন তারামন বিবি। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই অস্ত হাতে সহযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে নেমে পড়তেন তিনি। মোহনগঞ্জ, তারাবর কোদালকাঠি, গাইবান্ধার ফুলছড়ির বহু বিখ্যাত যুদ্ধে পুরুষ সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তারামন বিবি। কোদালকাঠিতে এক যুদ্ধে তিনি একই পাঁচ ছয়জন পাকিস্তানিকে ঘায়েল করেছিলেন।

সম্মুখ যুদ্ধ ছাড়াও গুপ্তচর সেজে পাক বাহিনীর বিভিন্ন খবর এনে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। শরীরে কাদা মেখে, চুলে জট পাকিয়ে, ছেঁড়া জামা পরে চলে যেতেন পাক বাহিনীর ক্যাম্পের সামনে। পাক বাহিনী তাকে পাগল ভেবে আমলে নিত না। কিন্তু তারামন বিবি তীক্ষ্ণ চোখে পাকবাহিনীর ক্যাম্প পর্যবেক্ষণ করতেন, তাদের গতিবেধি লক্ষ্য করতেন, মনে মনে ক্যাম্পের নকশাও বানিয়ে ফেলতেন। তারপর সেসব তথ্য এনে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। তার সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হতো যুদ্ধের নকশা। সেসব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারাই জয়লাভ করতেন। এছাড়াও যুদ্ধের আগে তারামন বিবি দূরদূরান্ত থেকে কলার ভেলায় করে যুদ্ধের জন্য গোলা বারুদ ও অন্যান্য রসদ নিয়ে আসতেন। 

 

স্বীকৃতি ও অন্যান্য 

স্বাধীনতা যুদ্ধে তারমন বিবির অসীম সাহসিকতার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তার বীরত্বভূষণ নম্বর ৩৯৪। যুদ্ধের পরপরই তিনি লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যান। তাকে খুঁজে বের করতে সময় লাগে ২২ বছর। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে তারামন বিবিকে খুঁজে বের করেন। তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেন অধ্যাপক আব্দুস সবুর ফারুকী ও সহযোদ্ধা সোলায়মান আলী। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বরে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার তারামন বিবির হাতে সম্মাননা পুরস্কার তুলে দেন। তারামন বিবি নিয়ে আনিসুল হক “বীর প্রতীকের খোঁজে” নামে একটি বই লিখেন। এছাড়াও আনিসুল হক “করিমন বেওয়া” নামে একটি নাটক লিখেন, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন তারামন বিবি। 

প্রয়াণ 

২০১৮ সালের ৮ই নভেম্বর হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তারামন বিবি। তখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহ সামরিক হাসপাতালে। অবস্থার উন্নতি না হলে বিকালেই হেলিকপ্টারে ঢাকা সামরিক হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে কিছুদিন পর বাড়িতে ফেরেন তিনি। কিন্তু ১লা ডিসেম্বর স্বামী সন্তানদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজিবপুর উপজেলার তালতলা কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়  করা হয়। 

মুক্তিযুদ্ধে মাত্র দুইজন নারী মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীকের খেতাব পেয়েছিলেন, তার মধ্যে একজন হলেন তারামন বিবি। দেশের স্বাধীনতায় তার এ ত্যাগ ও অবদান অনস্বীকার্য। তার বীরত্ব ও অসীম সাহসিকতার গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। ফলে বারবার উচ্চারিত হোক তারামন বিবির বীরত্ব গাঁথা সব গল্প। 

 

এরকম আরো ব্লগ পড়তে, এখানে ক্লিক করুন।

 

লেখক,

খায়রুল ইসলাম শুভ

ইন্টার্ন

কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট 

YSSE