¤ সাধারণ ভাবেই একজন যুবক এর সাফল্যের কথা শুনলে আমরা খুব একটা অবাক হই না। কারণ যুবক বয়সের সাফল্য অর্জন তুলনামূলক অন্য বয়স থেকে সহজ। যখন আমরা কোন বাচ্চা কিংবা বৃদ্ধের সাফল্যের গল্প শুনি অবাক না হয়ে পারা যায় না। তাইতো একটু অবাক করতে লেখবো এক বৃদ্ধের সাফল্যের গল্প –
¤ আমি যার জীবন নিয়ে গল্প লিখতে যাচ্ছি, তাকে বর্তমান জেনারেসন খুব ভালো করেই চিনে। যার নাম হারল্যান্ড স্যান্ডারস । তবে নাম বলাতে অনেক এ নাও চিনতে পারে। আচ্ছা যদি বলি তার বানানো রেসিপিতে সারা পৃথিবীতে বানানো হয় মজাদার চিকেন ফ্রাই – তাহলে মাথায় কার নাম আসে?
¤ নিশ্চয়ই KFC ( Kentucky Fried Chicken) । ঠিক ধরেছেন – আমি আজ তার জীবনের কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনা জানাবো আপনাদের।
¤ হারল্যান্ড স্যান্ডারস – যায় জন্ম আমেরিকার ইন্ডিয়ান অঙ্গ্যরাজ্যে । বাবা পেশায় ছিলেন একজন কৃষক, আশি একর এর এক খন্ড জমিতে তাদের একটি ফার্ম ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারান বাবা কে। ছোট্ট সন্তানদের নিয়ে তার মায়ের সংসারের চাকা ঘুরানো বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। তাও সময় তার নিয়ম মেনেই যেতে লাগলো। তার বাচ্চা বয়স শেষে এ বালক বয়স এ পা রাখা । বিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়া । খুব একটা ভালো ছাত্র ছিলো না সে। মোটামুটি পরীক্ষা গুলো তে হারল্যান্ড স্যান্ডারস এর পাশ আসতো বলে পরের শ্রেনীতে উঠতে পারতো। এভাবেই তার বয়স বারো তে পা দিল। আর তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ ছিল রান্না করা । সে মাঝে মাঝে মায়ের অনুপস্থিতিতে রান্না করে খাওয়াতেন ভাইবোনদের।
¤ কিন্তু এর মধ্যে ঘটলো এক বিষাদ ঘটনা। তার মা বিয়ে করলেন অন্য এক লোক কে। আর জীবন এর উত্থান পতন শুরু হয় তখন থেকেই। পানির দামে তার বাবার ফার্মটি বিক্রি করে নতুন বাবা সহ চলে এলেন গ্ৰীনউডে। কিন্তু নতুন বাবার সাথে তার মনের কোন মিল ছিলো না । যার কারণে ঘর ছাড়লেন মাত্র তের বৎসর বয়সে। ফলে পড়ালেখা হলো মাত্র সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত।
¤ ঘর ছাড়াতে নিজের পেটের দায়ে করতে হলো একেক সময় একেক রকম কাজ। তাছাড়া ছোট বেলা থেকে তার এক কাজে বেশী দিন মন বসতো না। মেজাজ এর দিক থেকে ছিলেন বদ প্রকৃতির । কখনো করতেন বাস কোম্পানিতে কন্ডাক্টর এর কাজ কখনো বা সেনাবাহিনীর চাকরি, রেলে কামারের কাজ, রেলের ইঞ্জিন থেকে ছাই সাফাইয়ের কাজ, ইঞ্জিনে কয়লা জোগানের কাজ এভাবে কত কি।
¤ ধীরে ধীরে বয়স পৌছে গেছে টিনেজ এ। বয়স যখন আঠারো কৌতুহল আর আবেগ এর বশে বিয়ে করে বসলেন জেসিফিন নামে এক মেয়ে কে। তার সংসার এ যোগ হলো এক ছেলে সন্তান আর দুই মেয়ে সন্তান। কিন্তু টনসিল সংক্রমণ এ মারা যায় ছেলে টি।
¤ এরপর করেসপন্ডেন্স কোর্সে আইন পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু তার মাঝেই চলে গেল রেলবোর্ডের চাকরি – কর্মক্ষেত্রে বিবাদের জেরে। দুই মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী চলে গেলেন তাঁর বাবা মায়ের কাছে। আইন পাশ করে প্র্যাক্টিস শুরু করলেন বটে। ভালই উপার্জন চলছিল। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেল বদমেজাজের জন্যই। নিজের মক্কেলের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়লেন ঝামেলায়।
¤ এরপর জীবন বীমায় কাজ করেছেন। শুরু করেছেন নিজের ফেরি কোম্পানি। সেটা বন্ধ করে খুললেন অ্যাসিটিলিন বালব তৈরি। তাও চলল না। বাজারে এসে গেল ইলেক্ট্রিক বালব।
¤ জীবন স্রোতে ভাসতে ভাসতে এলেন কেন্টাকিতে। একাজ সেকাজের পরে থিতু হলেন অয়েল কোম্পানির কাজে। এর মাঝে আবার জড়িয়ে পড়লেন খুনের মামলাতেও। কোন রকম সেখান থেকে পার পেলেন।
¤ এরপর তিনি ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে সেলসম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন । তার বিশৃঙ্খল ক্যারিয়ার জীবনে আরও একটি ব্যর্থতা যোগ হয় । তারপর তিনি একটি ছোট ক্যাফেতে বাবুর্চির কাজ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন ।
¤ ৬৫ বছর বয়সে তিনি সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন । অবসর নেওয়ার প্রথম দিন সরকারীভাবে ১০৫ ডলারের একটি চেক হাতে পান । এটি যেন যেন বৃদ্ধ বয়সে গালে চড় মারার মত অবস্থা। তিনি মারাত্মক অসহায় হয়ে পরলেন। মাসিক মাত্র ১০৫ ডলার দিয়ে কীভাবে তিনি গোটা মাস সারভাইভ করবেন? তিনি ভেবে কূলকিনারা খুঁজে পান না । একজন চূড়ান্ত ব্যর্থ মানুষের পরিণতি তার ।
¤ একের পর এক ব্যর্থতা যোগ হলো তার জীবনে । জীবন এর সাথে আর পেরে উঠতে না পেরে চিন্তা করলেন আত্মহত্যা করবেন। একটি নির্জন বনে গেলেন , সেখানে গাছের নিচে বসে সুইসাইড নোট লেখলেন। মনে মনে আবার ভাবলেন জীবন টা কে কি আর একবার সুযোগ দেওয়া যায় না। হঠাৎ মনে হলো – আরে আমি তো বেশ ভালো রান্না করতে পারি। যার মধ্যে চিকেন ফ্রাই সেরা । যা সবার থেকে আলাদা স্বাদের । আমার ই প্রতিভা কে একবার কাজে লাগিয়ে দেখি না কি হয়!
¤ ফিরে আসেন জীবন টা আর একবার সুযোগ দিতে। ৮৭ ডলার ধারে বিনিয়োগ করলেন। ক্রয় করলেন একটি কড়াই ও তার প্রয়োজনীয় উপকরণ। প্রথম অল্প কিছু চিকেন ফ্রাই করে খাওয়ালেন প্রতিবেশীদের। মোটামুটি সাড়া পেলেন। তারপর ব্যবসায়িক চিন্তা মাথায় নিলেন। প্রতিবেশীদের কাছে কিছু চিকেন ফ্রাই বিক্রি করলেন। আবার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট এ সরবরাহ দিতে চাইলেন।
¤ কিন্তু সেই পুরোনো ব্যর্থতা আবার পেয়ে বসলো। কিন্তু এবার আর হাল ছাড়েন নি। একে একে ১০০৯ বার চিকেন ফ্রাই সাপ্লাই দিতে চাইলেন। কিন্তু কোন রেস্টুরেন্ট-ই নিতে চাইলো না। তবে ১০১০ তম বার এর চেষ্টায় একটি রেস্টুরেন্ট তার চিকেন ফ্রাই নিতে রাজি হলো । আর তখনই জন্ম হলো বিশ্বের জনপ্রিয় এই KFC ব্র্যান্ড এর।
¤ বর্তমান সময়ে KFC এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। যেহেতু তার মসলার ধরণ ছিল ইউনিক। যা হারল্যান্ড স্যান্ডারস ছাড়া আর কেউই জানতো না । ফলে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকলো KFC ( Kentucky Fried Chicken ) । ৮৮ বছর বয়সে হারল্যান্ড স্যান্ডারস কয়েক বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়ে উঠেন । আর তার প্রতিষ্ঠান KFC হয়ে উঠে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম খাবারের সম্রাজ্য । বর্তমানে ১২৩ টি দেশে ২০,০০০ এর বেশি লোকেশনে KFC এর বিস্তার ।
¤¤ যার শুরু মাত্র ৮৭ ডলার দিয়ে।
¤¤ হারল্যান্ড স্যান্ডারস এর জীবন এর গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি অনেক কিছু। আমদের এ বর্তমান প্রজন্ম অল্পতে হাল ছেড়ে দেয় । একবার ব্যর্থ হলে, ধরে নেয় আর হবে না কিছু আমাকে দিয়ে । আর তখন আত্মহত্যা কে সমাধান ভেবে বসে। কিন্তু দেখুন স্যান্ডারস হাজার বার ব্যার্থ হয়ে ও দমে যায় নি। বার্ধক্য তার বাঁধা হতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর চেষ্টা মৃত্যুর পর ও সবার মাঝে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার জীবনের গল্প আজ ব্যর্থ জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার প্রতীক।
এমন আরো ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন
Writer,
Nowraj Jahan Naziya
CWD, YSSE .
