এ পৃথিবীতে তো আছে কত রকমের ভাষা। কেউ কথা বলে বাংলায়, কেউ ইংরেজিতে, কেউবা মান্দারিন ভাষায়। জন্ম থেকে হোক বা জীবনের কোন এক পর্যায়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার জন্য হোক, যারা হারিয়েছেন বাকশক্তি, তাদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাষা। আমরা যেভাবে কণ্ঠের সাহায্যে ভাষার প্রকাশ করি, তারা করেন ইশারা ইঙ্গিতে। তাদের এ ভাষাকে বলা হয় সাইন ল্যাংগুয়েজ বা সাংকেতিক ভাষা।
বাকশক্তিহীন মানুষদের আশার আলো হিসেবে আগত সাইন ল্যাংগুয়েজ নিয়ে কয়জনই বা জানি? এর ইতিহাস কয়জনেরই বা আছে জানা? আজ আপনাদের এ নিয়ে অবগত করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমার এ ছোট প্রয়াস।
যেভাবে হলো শুরু
অনেকেই হয়তোবা ভেবে থাকবেন, সাইন ল্যাংগুয়েজ? এটি তো নতুন জিনিস। বেশিদিন আগে তো এর উদ্ভাবন হয়নি। আসলে ব্যাপারটি তা নয়। এর নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন সভ্যতাগুলোয়, যেখানে মূক ও বধির মানুষজন ইশারা ইঙ্গিতে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতেন। এ প্রাচীন সমাজগুলোয় মূক ও বধির জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করার উদ্দেশ্যেই মূলত সাইন ল্যাংগুয়েজ এর জন্ম দিয়ে থাকেন। এরকম প্রথম দিকের সাইন ল্যাংগুয়েজ এর উল্লেখ প্রাচীন গ্রিসের প্লেটো এবং এরিস্টটলের কাজসহ প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।
অষ্টাদশ শতকের অগ্রগতি
১৮ শতকে সাইন ল্যাংগুয়েজের ইতিহাসে আসে এক নতুন মোড়। ১৭৫৫ সালে একজন ফরাসি শিক্ষাবিদ, যার নাম ছিল চার্লস মিশেল দে ল’পেই প্যারিসে প্রতিষ্ঠা করেন বধির ব্যক্তিদের জন্য প্রথম পাবলিক স্কুল। তিনি এর নাম দেন ‘’ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেফ মিউটস’। ল’পেই বধির ছাত্রদের যোগাযোগকে সহজ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিগত যোগাযোগ ভাষার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন বিধায় ফরাসি সাইন ল্যাংগুয়েজ (LSF) এর উপর ভিত্তি করে একটি ম্যানুয়াল বর্ণমালা এবং চিহ্ন তৈরি করেন। তার এ উদ্যোগ বধির ব্যক্তিদের শিক্ষাগ্রহণকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সাইন ল্যাংগুয়েজকেও যোগাযোগের একটি অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আধুনিক সাইন ল্যাংগুয়েজ এর উত্থান
উনবিংশ এবং বিংশ শতক জুড়ে সাইন ল্যাংগুয়েজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনভাবে বিকাশ লাভ করে। LSF এবং বধির সম্প্রদায়ের জীবন থেকে নেয়া অভিজ্ঞতার সাথে মিশে একাকার হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ASL অর্থাৎ আমেরিকান সাইন ল্যাংগুয়েজ স্বতন্ত্র এবং প্রাণবন্ত ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইভাবে ব্রিটিশ সাংকেতিক ভাষা বা BSL এবং অন্যান্য জাতীয় সাংকেতিক ভাষার বিকাশ ঘটতে থাকে। এ প্রত্যেকটি ভাষারই আলাদা ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডার রয়েছে যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।
স্বীকৃতি
সাইন ল্যাংগুয়েজ আধুনিক যুগে পূর্ণতা লাভ করলেও বেশিরভাগ সময় জুড়ে হয়েছে বৈষম্যের শিকার। নানারকম কুসংস্কারের জন্য বধির ব্যক্তিদের শিক্ষা, চাকরি এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। এর ফলে তাদের জন্য সৃষ্ট সাইন ল্যাংগুয়েজকেও দেখা হতো অন্যান্য ভাষা থেকে নিচুস্তরের ভাষা হিসেবে। এক পর্যায়ে ব্যক্তিসচেতনতা গড়ে উঠতে শুরু করে এবং সমাজের বধির সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে সমাজের বোঝা নয়, বরং সমাজের অন্য সকল মানুষের সমান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়। সে সাথে তাদের সাইন ল্যাংগুয়েজও সমান মর্যাদা পায়।
১৮৮০ সালের দিকে মিলানে স্কুলগুলোতে সাইন ল্যাংগুয়েজ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব পাশ করা হয়। এর ফলশ্রুতিতে কয়েক দশক জুড়ে বধির সম্প্রদায়ের উপর চলে বৈষম্য ও নিপীড়ন। তবে বধির সম্প্রদায় এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের চালিয়ে যাওয়া প্রতিবাদের ফলে এ আইন শিথিল করা হয়। অবশেষে কথ্য ভাষার সাথে সাংকেতিক ভাষাকেও সমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এক নতুন উচ্চতা
বর্তমান সময়গুলোতে সাইন ল্যাংগুয়েজ পেয়েছে অন্য সকল ভাষার সমমর্যাদা। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ অবশেষে সাইন ল্যাংগুয়েজকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং বধির সম্প্রদায়ের যোগাযোগ এর প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে সাইন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করার অধিকার নিশ্চিত করে। এটি হয়ে দাঁড়ায় সাইন ল্যাংগুয়েজ এর জন্য এক নতুন মাইলফলক৷
এরপর আর সাইন ল্যাংগুয়েজকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অবদানে সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখা হয়ে গিয়েছে অত্যন্ত সহজসাধ্য। তাই যে কেউ সাইন ল্যাংগুয়েজ শিখে নিতে পারছে। সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখার জন্য আপনাকে বধির হতে হবেনা। শুধু থাকতে হবে বধির সম্প্রদায়ের জন্য সম্মান।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন।
লেখক :
তাসরিবা তাজরিন ,
ইন্টার্ন,
কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
