মানবসভ্যতার আদিম একটি পেশা, কৃষি। মানুষ তখন মূলত দুইভাবে খাবার সংগ্রহ করত। প্রথমত বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করে আর দ্বিতীয়ত পশু শিকার করে। ফলমূল সংগ্রহের কাজটি করত নারীরা। এই কাজটি করতে গিয়ে নারীরা একটি চমৎকার ব্যাপার লক্ষ্য করেন। সেটা হলো ফলের বীজ মাটিতে ফেলে দেয়ার পর সেখান থেকে নতুন চারা গজাচ্ছে। এটাই ছিল কৃষির প্রাথমিক বিকাশ। ফলে বলা যায় কৃষির শুরুটা হয় নারীর হাত ধরেই।
বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর যে অবদান তা বুঝতে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন নেই। একটি গ্রামীন পরিবারে দেখা যায় একজন নারীর দিন শুরু হয় ভোরের কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে, হাঁস মুরগিকে খাবার দেওয়া, গোয়ালঘর পরিষ্কার, গৃহস্থলী সব আবর্জনা কোন গর্তে ফেলা প্রভৃতি। গর্তে ফেলা সেই ময়লা থেকেই তৈরি হয় জৈব সার, যা পরবর্তীতে কৃষক তার জমিতে ব্যবহার করেন। কৃষির উন্নতি সাধনে এই জৈব সার, নারী হাত ধরেই উৎপাদিত হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিটি গ্রামীণ বাড়িতে নারীরা বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ও ফল ফুলের গাছ লাগিয়ে থাকেন। উঠোনে দু-চারটি মরিচ গাছ, বেগুন গাছ, ঘরের চালে পুঁইশাক, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, বাড়ির পিছনে শিম বা বরবটি, এছাড়াও ফলের গাছ যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি নারীদের হাতের স্পর্শেই বেড়ে উঠে।
উদ্ভিদের প্রজনন সম্পর্কেও নারীদের মধ্যে বেশ সচেতনতা দেখা যায়। ফল বা সবজির নিরোগ ও উন্নত জাতের চারা তৈরিতেও নারী-রা বেশ দক্ষ। অনিষ্ঠকারী পোকামাকড় বা রোগ জীবাণু থেকে গাছকে রক্ষা করতে অবলম্বন করেন চমৎকার সব পদ্ধতি। যেমন শিম গাছে জাব পোকা আক্রমণ করলে, ঘরে থাকা ছাই গাছে ছিটিয়ে দেন, এতে পোকার আক্রমণ কমে যায়। আবার শস্যদানা বা বীজ সংরক্ষণের সময় উনারা নিমপাতা ব্যবহার করেন। এসব পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নারীর হাত ধরেই বিস্তার লাভ করছে।
বাংলাদেশে কৃষিকাজের ক্ষেত্রে মজুরী ভিত্তিতে নারীদেরকে দুটি প্রেক্ষাপটে কাজ করতে দেখা যায়। ক. অবৈতনিক, মূলত গৃহিণী নারীরা যারা কোন ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করে এবং খ. বৈতনিক বা দীনমজুর, যারা অল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করেন। উপরে গ্রামীণ নারীদের কাজের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তা মূলত প্রত্যহিক কাজের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এখানে মজুরিকে গণ্যই করা হয় না, ফলে স্বীকৃতির বিষয়টি হয়ে পরে পুরোই অবান্তর। আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখা যায় বৈষম্যমূলক মজুরি ব্যবস্থা। অঞ্চলভেদে যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক পায় ৫০০-৭০০ টাকা, সেখানে একজন নারী শ্রমিক পান ৩০০-৫০০ টাকা। অথচ, চারা রোপন, সেচ প্রদান, সার প্রয়োগ, ফসল উত্তোলন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা পুরুষের থেকে মোটেও কম নয়।
২০১৮ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, দেশে বিদ্যমান ২ কোটি নারী শ্রমশক্তির মধ্যে, কৃষিতে নারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ। ১৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সী নারীরা মূলত কৃষি কাজ করে থাকেন। শ্রমশক্তির এই জরিপগুলোতে দেখা যায়, কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিগত পাঁচ বছরে কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আরো প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষিতে নারীর অবদান জন্য বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কারের ১০টি ক্ষেত্রের মধ্যে ‘কৃষিতে মহিলাদের অবদান’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এধরণের পুরুষ্কার বা স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। আরো প্রয়োজন:-
- নারীদের জমির মালিকানার উপর গুরুত্বারোপ;
- আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রদান;
- খাস জমিতে লিজ সুবিধা;
- সরকারি প্রণোদনা সুবিধা;
- কৃষক কার্ড সুবিধা; এবং
- যথাযথ মজুরি প্রদান।
বর্তমানে দেশের জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অবদান হওয়ার কথা ছিল ৪৮ শতাংশ। এর পিছনে রয়েছে, নারী শ্রমকে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সাথে দৃশ্যমান না করা। নারীদেরকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করতে হলে তাদের অবমূল্যায়িত কাজ জাতীয় অর্থনীতিতে গণনা করতে হবে। এছাড়াও নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও ছুটি, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি বাস্তবায়ন করতে হবে। উচ্চ ফলনশীল কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে যথা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলার প্রাচীনকাল থেকেই নারী কৃষির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নারীদেরকে যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান ছাড়া একপাক্ষিকভাবে কখনোই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই, নারীদেরকে আবশ্যিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরি।
এরকম আরো ব্লগ পড়তে এখানে, ক্লিক করুন।
লেখক
খায়রুল ইসলাম শুভ
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট
YSSE
