আমাদের সময়ের প্রতিটি বীভৎস ভোর শুরু হয় মৃত্যুর শেষ ঠিকানার গহীন অন্ধকারকে সামনে রেখে। জীবনের অবাক বাকরুদ্ধতায় কখনো না কখনো আমরা পড়ে থাকি শব্দহীন এই জগতে। 

আমাদের এই বধির জগতে প্রতিধ্বনি হয় সদম্ভে ভরা, চাকচিক্যে জড়ানো, বিশাল অট্টালিকায় কৃত্রিম সবুজের মিথ্যা কোলাহলে। সংবাদপত্রের মতো দর্পণে দর্পিত হয় নিত্যদিন কত হত্যা, কত বঞ্চনা, কত ধ্বংস, কত কাপুরষত্বা! এক নিরপরাধের শিরার রক্ত লেগে থাকে কোন না কোন শাস্তিহীন অপরাধীর ধমনিতে। শ্বাপদের নির্ভুল আঘাতে ভেঙে যায় কারোর জীবনের বর্ণিল খেলাঘর। 

সমস্যাটা বহুদিন ধরেই অনুভব করছেন ফারহান সাহেব। মাথা অসম্ভব ভারী লাগে সন্ধ্যার পর থেকে। অবচেতন মনে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে থাকেন। কার অস্পষ্ট চেহারা যেন স্বপ্নেও আসে, জিনিসটা যেন কি বলার চেষ্টা করে উনাকে।প্রায়ই সে অবস্থাতেই হঠাৎ করে চমকে উঠেন ঘুম থেকে।বারবার সেই স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। তার ধারণা কোন মানসিক সমস্যা না তো?! 

রাত দুটো। নিস্তব্ধ শহর। পূর্নিমার রাত। বাহিরে গাছপালা ডালের জানালার সাথে ধাক্কার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

ফারহান সাহেব ঘুমিয়ে আছেন,পাশে উনার স্ত্রী। স্বপ্নে সেই বস্তুকে আজও দেখলেন। কিন্তু এবার বেশ স্পষ্ট আগেরবার চেয়ে। বারো-তেরো বছরের বালক। ফুটপাতে এক কোণে বসে আছে সে। 

ফারহান সাহেব জিগাস করলেন, “কি নাম তোমার?”

“গ্যাদা”

“এটা কেমন নাম?”

“হ সাহেব, গরীবগো নাম অমন-ই হয়”

“তোমাকে এখন থেকে বকুল বলে ডাকব, কেমন? পছন্দ হয়েছে?”

“হ, হইছে।”

“কিন্তু বকুল! তোমার শরীরে এত্ত ধুলোজমা ময়লা কেন? একি! এটা তো শুকনো রক্ত! তোমাকে এখনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।”

“ডাক্তার আমার কুনো ব্যাদনা কমাইত বা কিছু কইরতে পারত না।আফনের চিন্তা না কইলও হইব।”

“তুমি কি আমাকে অপছন্দ করছ? কেন?”

“আফনে মাইনষ ভালানা। অইন্যের বিপদ দ্যাইখলে চইল্যা যান। এহন ক্যান আইছেন? যান, নিজের বিশ্যাল বাড়িত গিয়্যা ঘুমান গ্যা” 

লাফ দিয়ে উঠলেন ফারহান সাহেব। ঘামে শরীর ভিজে গেছে। চিনচিন মাথা ব্যথাও শুরু হয়েছে। উনি মনেই করতে পারছেন না কবে বকুলের সাথে পূর্ব সাক্ষাৎ হয়েছে।

উনার স্ত্রী বললেন,”কি হয়েছে? বাজে স্বপ্ন দেখেছ?” ফারহান সাহেব কিছু বললেন না, শুয়ে পড়লেন।কিন্তু সারারাত ঘুমানো গেলনা। 

সাময়িক জীবনে বিচলিত হও তোমরা, জীবনের কার্পণ্যতা ঠিকই বোঝো। একটুও কি অপরাধী মনে হয় না তোমাদের বিবেকে?

আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্নে পেশাদার খুনীর কর্মঠ অফিস-আদালতে, অন্যকে অসির ধারালো হুংকারে পিষে। বোঝো কি, কতজন হারিয়ে যায় তোমাদের তীব্র ক্ষমতার লোভে। 

 

ফারহান সাহেব অফিসে যান না, মেজাজ দিনদিন কেমন বিগড়ে যাচ্ছে, অথচ সফল ব্যবসায়ী এক নামে চিনে সবাই উনাকে। 

এক দুপুরের মূদু বাতাসে ঘুমঘুম চোখে আবারও ফিরে এলো সেই রাত্রির ঘটনা। 

“ভালা লাগে না কিছু, স্যাইর। মা এর কথা খুউব মনে পড়ে।”

“বকুল, কি হয়েছে তোমার মায়ের? আর, তোমার বাবা কোথায়?”

“বাপ নাই। ছাইড়া গেছে বহুৎ আগে। বাস চাপায় আহত হইয়া মায়ে হাসপাতালের বারান্দায় পইড়া আছে। কিন্তু আপনেরা বড্ড খারাপ। আজেবাজে কাজে খরচা কইরলে গরিবগো সাহায্য করেন না।”

“কি বলছ! তুমি কালকে আমার সাথে দেখা করবে। আমি টাকা দেব।”

“পারুম না। আমি তো মৃত। ওরা আমারে মাইরা ফালাইছে।”

“কারা!”

“কোথাও টাকা না পাইয়া মা টারে বাঁচানোর জন্য অন্যের পকেটে হাত দেই। এই অপরাধে ওরা আমারে মাইরা ফেলছে।এর লেইগা আপনিও দায়ী।” 

“আমি? কেন!!?” 

“আপনি দূর থেইকা বসে সব দ্যাখছিলেন। সাহেব? আমার মা রে বাচাইবেন? দয়া কইরা বাঁচান।” পাগলের মতো চিৎকার করে ডাকতে থাকলো বকুলকে কিন্তু কোন সাড়া পেল না। 

পরের দিনই ফারহান সাহেব ঘুম থেকে উঠে হাসপাতালে গেলেন বকুলের মায়ের খোঁজে। খোঁজ চালানো হচ্ছে। বকুল কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা বলেনি। অনেক খোঁজার পরেও রোগীকে না পেয়ে কিছুটা হতাশ হলেন ফারহান সাহেব। শেষ মুহূর্তে কোন এক ভাবে বকুলের মায়ের খোঁজ পাওয়া গেল। কিন্তু ততক্ষণে,বকুলের মা টাকার অভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে নিয়েছে। জানা গেল, সাধারণ ওয়ার্ডে তাকে রাখা হয়েছিল কিন্তু কোন আত্নীয়র খোঁজ না থাকায়, টাকা সময়মতো না দিতে পারায় তাকে শেষমেশ বারান্দায় ফেলে রাখা হয়। 

হঠাৎ করে বকুলের কন্ঠ শুনতে পেলেন মনে হল, ফারহান সাহেব। বকুল বলছে, “সাহেব আমি চলে যাচ্ছি।” 

“বকুল, শোনো আমার কথা! কোথায় যাচ্ছ?! আমি চেষ্টা করেছি বকুল, বিশ্বাস করো! “

” আপনি অন্তত চেইষ্টা করছেন সাহেব। এর লেইগ্যা আফনের কাছে আইছিলাম। আর দ্যাখ্যা হবে না।” 

সমাজের বিবেক আজ বাঁধা পড়ে আছে হৃদয়হীন বুলেটের আগ্রাসী নীরবতার কাছে। রক্তাক্ত দিয়ে জয় করা মাতৃভূমির জীর্ণ শরীরে শ্বাসরুদ্ধ হয় ইতিহাস বারবার। এই শহরের প্রতিটি কফিনে লেগে থাকে সভ্যতার কালোদাগ। 

ভোরের আলো বাধা পড়ে যায়, রাতের নিশাচর কুঠুরিতে। অবরুদ্ধ এই শহরে কত  প্রাণ  হারায়,শুধু একচিটিয়ে দের বেচে থাকার স্বাধীনতার লক্ষ্যে। 

দূর আকাশে কেউ কি শোনে এ শহরে শুকিয়ে যাওয়া কান্না গুলো? এ শহরের বিষাক্ত আকাশে সুদূর দিগন্তে কেউ কি অনুভব করে অন্তর্যামীর এই ব্যথিত মুখ? এই নাট্যকর জীবন থেকে চলমান গতিতে সব স্মৃতি হারিয়ে যায়, আরেকদিনের স্বার্থপরের বিলাসিতার জন্যে। 

To read more blogs, click here.

 

Writer:-

Fatema tuz Zannat Oyshi

Junior Associate, Content Writing department

YSSE