আমরা সকলেই প্রায় প্রাচীর শব্দটির সাথে পরিচিত যেমন চীনের মহাপ্রাচীর, বার্লিন প্রাচীর, জার্জান প্রাচীর, হাড্রিয়ান প্রাচীর আরও কত কী! নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে জার্মানির উপসাগরে বাল্টিক প্রাচীর। যা উল্লখিত প্রাচীর গুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কারণ প্রথমে উল্লেখিত সব প্রাচীরই স্থলে অবস্থিত কিন্তু বাল্টিক প্রাচীর তার থেকে ভিন্ন যেটির সন্ধান পাওয়া গেছে সাগরের তলদেশে।

 

বাল্টিক প্রাচীরের সন্ধান পাওয়া যায় জার্মানির বাল্টিক উপসাগরের তলদেশে যেটি প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর। বিজ্ঞানিদের মতে এটি তৈরি হয়েছিল প্রস্তর যুগে এবং প্রত্মতাত্ত্বিক বিদেরা মনে করেন এটি ইউরোপের মানুষের তৈরি প্রাচীন নির্মাণ। প্রস্তর যুগ বলতে এমন একটি সময়কালকে বোঝানো হয় যখন মানুষের একমাত্র হাতিয়ার ছিল পাথর। এই সময়টি প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন বছর  ক্ষনস্থায়ী ছিল এবং ধাতব কাজের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু প্রাচীরটি পাথরের তৈরি তাই প্রস্তর যুগের নিদর্শন বলেই ধরে নেয় বিজ্ঞানিরা।

গবেষকদের মতে, প্রাচীরটি পানির ২১ মিটার অথবা ৭০ ফুট নিচে অবস্থিত যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৬৭৩ টি বড় ও ভারী পাথর। তখন ছিল না কোনো আধুনিক প্রযুক্তি কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো কিভাবে তারা তৈরি করেছেন ভারী পাথর ও নিখুঁত শিল্পকার্য দিয়ে। এটির উচ্চতা প্রায় এক কিলোমিটার অর্থাৎ  এক কিলোমিটারের চেয়ে কিছু কম এবং দৈর্ঘ্য ৯৭১ মিটার। এটি তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে ৩০০ টি বোল্ডার এবং এই বোল্ডার গুলোকে সংযুক্ত করেছে ১ হাজার ৪০০ টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর খন্ড। আরও ধারণা করা যায় যে এটি হ্রদের পাশে পাশে শুকনো জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে যার ওজন প্রায় ১৪২ টন। 

মেকলেনবার্গ উপসাগর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে একটি জায়গায় কিছু শিক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়েছিলেন শিক্ষা সফরে সাথে ছিলেন কয়েক জন বিজ্ঞানীও। তখনই একদল বিজ্ঞানী সমুদ্রের নিচে কিছু জিনিস পর্যবেক্ষণের সময় প্রাচীরটির সন্ধান পান।

ডঃ জ্যাকব গিয়ারসেন দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন প্রাচীরটি তৈরি করা হয়েছিল মূলত রেইনডিয়ার বা বল্গা হরিণ শিকারের জন্য। তারা দ্রুত গতির প্রাণীদের উপর ঝাপিয়ে না পড়ে অবকাঠামো হিসেবে এই প্রাচীর ব্যবহার করতো। এর তিন ফুট উচ্চতা মানুষ পাড়ি দিতে পারলেও পারতো না আহত হরিণ। বর্তমানে গবেষকরা বাল্টিক প্রাচীরের আশপাশ থেকে পশুর হাড়গোড় খোঁজার চেষ্টা করছেন যাতে তাদের অনুমানটি আরো জোরদার হয়।

অনুমান করা যায় যে, এই প্রাচীরের অদূরে আরেকটি প্রাচীর ছিল যেই প্রাচীরটি সমুদ্রের পলির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছে। এই প্রাচীর পার করে বলগা হরিণ আসলেই তির-ধনুক দিয়ে তাদের শিকার করা হত। অদূরে আরেকটি প্রাচীর থাকার কারণে আহত শিকার পালাতে পারত না এবং শিকাদের ফাঁদে পড়ত।এছাড়া বিজ্ঞানীরা প্রাচীরের আকার, গঠন ও কারুকার্য দেখে আরও নিশ্চিত হন যে এটি কোনোভাবেই প্রাকৃতিক তৈরি নয়। সাধারণত হিমবাহে পলি সঞ্চয় করে অনেক সময় সমুদ্রগর্ভে প্রাচীর তৈরি হয়ে থাকে। সনামির সময় ঢেউয়ের সঙ্গে বালি, পলি ভেসে এসেজমা হয় সমুদ্রগর্ভে তাতেই তৈরি হতে পারে প্রাচীর। কিন্তু এই প্রাচীরটি সেভাবে তৈরি হয়নি এটি তৈরি করেছেন মানুষ কারণ এর নিখুঁত গঠনকার্য। 

বাল্টিক প্রাচীর বাল্টিক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৮ ফুট গভীরে অবস্থিত। গবেষকদের ধারণা এটি সাড়ে ৮ হাজার বছর আগে ডুবে গেছে। এর ডুবে যাবার কারণ হলো ক্রমাগত সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি।

এর নিখুঁত আকার, আকৃতি ও গঠনশিল্পের কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে ইউরোপের প্রাচীনতম মেগাস্ট্রাকচার। এছাড়াও ধারণা করা যায় যে এটি হলো বৃহৎ গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল। কারণ তখন ছিল না কোনো উন্নত প্রযুক্তি, ছিল না আজকের মতো দক্ষ কারিগর তাই সমন্বিত প্রচেষ্টাই ছিল তাদের একমাত্র বল।গবেষণা করে লাইবনিজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা জানতে পারেন কিভাবে প্রস্তর যুগের মানুষেরা হরিণ শিকার করত। এছাড়াও তারা জানতে চেষ্টা করেন আদিযুগের মানুষের উন্নত চিন্তা ধারা এবং বসবাসের পদ্ধতি। 

বর্তমানে গবেষকরা বাল্টিক প্রাচীরের আশপাশ থেকে পশুর হাড়গোড় খোঁজার চেষ্টা করছেন যাতে তাদের অনুমানটি আরো জোরদার হয়।

 

এরকম আরো ব্লগ পড়তে ক্লিক করুন 

 

লেখিকা,

মৌসুমী আক্তার রিতু 

ইন্টার্ন, কন্টন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট 

YSSE