থ্যালাসেমিয়া একটি রক্ত জনিত সমস্যা অর্থাৎ এটি এমন একটি রোগ যা বংশগতির বাহক ও ক্রোমোজোমের মাধ্যমে বংশানুক্রমে সংক্রামিত হয়। 

এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা “অ্যানিমিয়া” রোগে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটতে পারে। 

থ্যালাসেমিয়া দুইটি প্রধান ধরনের হতে পারে: 

১) আলফা থ্যালাসেমিয়া (ক. আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর , খ. আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর)

২) বিটা থ্যালাসেমিয়া। (ক. ß থ্যালাসেমিয়া মেজর, খ. ß থ্যালাসেমিয়া মাইনর)। সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া, ß থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র।

থ্যালাসেমিয়া একটি রক্তের অস্বাভাবিক অবস্থা ও রক্তস্বল্পতা জনিত রোগ, এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার উচ্চ প্রকোপ রয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। সঠিক রোগীর সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে, তবে অনুমান করা হয় যে দেশের হাজার হাজার মানুষ থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বসবাস করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রায় কোন কোন ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ৭% আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ১০% রোগী থ্যালাসেমিয়ার বাহক। প্রতিবছর ৬০০০ নতুন থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্ম নিচ্ছে। প্রতি ১৪ জনে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকে এবং প্রায় ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়ার বাহক আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে এসেছে।

থ্যালাসেমিয়া বংশগত জেনেটিক মিউটেশনের কারণে হয় যা হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনে ‌ব্যাঘাত ঘটায়। 

বাংলাদেশের মূলত সবচেয়ে বেশি বিটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের রক্ত সঞ্চালন নির্ভর করে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা বা লক্ষণ এর উপর। থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয় কিন্তু যদি থ্যালাসেমিয়া মাইনর হয় সেক্ষেত্রে রক্ত প্রতিস্থাপনের তেমন প্রয়োজন হয় না। 

বাংলাদেশে আগের থ্যালাসিমিয়া আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বর্তমানের অবস্থা ভিন্ন। 

রক্ত দেওয়াই কী থ্যালাসেমের একমাত্র চিকিৎসা? এই প্রশ্নটি অনেকেই করে থাকে। তবে হ্যাঁ, রক্ত দেওয়ার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের একমাত্র চিকিৎসা নয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের শুধুমাত্র রক্ত প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নয় এছাড়াও কিছু বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে। 

জিন থেরাপি : থ্যালাসেমিয়ার সম্ভাব্য নিরাময় হিসেবে জিন থেরাপির অপরিসীম অবদান রয়েছে। এটি সুস্থ লাল রক্ত কোষের বা হিমোগ্লোবিন পুনরায় উৎপাদন করতে রোগীর জিন পরিবর্তন করে। যদিও জিন থেরাপি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলি আশানুরূপ ফলাফল দেখিয়েছে, যা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। যদিও বাংলাদেশের মতো সম্পদ-সীমিত দেশে জিন থেরাপির চিকিৎসা অনেকের কাছে ব্যয়বহুল হতে পারে। তবে চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং গবেষণায় চলমান অগ্রগতি ভবিষ্যতে উক্ত পদ্ধতি আমাদের বাংলাদেশেও বাস্তবায়নের আশা দেয়।

অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন : এটি আরো একটি বিকল্প পদ্ধতি। অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন (বিএমটি) থ্যালাসেমিয়ার একটি প্রমাণিত চিকিৎসা যা নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা দূর করতে পারে। প্রক্রিয়াটির মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ অস্থি মজ্জাকে সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সক্ষম সুস্থ দাতা কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি অনেক রোগীর জন্য সফল হয়েছে, এর জন্য একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ দাতা খুঁজে বের করতে হবে এবং এটি ব্যয়বহুল হতে পারে। অস্থি মজ্জার প্রতিস্থাপন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ বাংলাদেশে BMT এর  ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

আয়রন চিলেশন থেরাপি : থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ঘন ঘন রক্ত দেওয়ার কারণে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়। আয়রন চিলেশন থেরাপি, যা শরীর থেকে অতিরিক্ত আয়রন অপসারণের জন্য কার্যকরী একটি পদ্ধতি, আয়রন ওভারলোডের কারণে অঙ্গের ক্ষতি প্রতিরোধ করতে পারে। সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য আয়রন চিলেশন থেরাপির বিকাশ, সেইসাথে তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশের থ্যালাসেমিয়া রোগীদের উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত করতে পারে।

সহায়ক যত্ন এবং মানসিক সুস্থতা : থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেঁচে থাকা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও কষ্টের। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মানসিক বিকাশ, শান্তি ও সহায়তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা গড়ে তোলা তাদের সামগ্রিক সুস্থতার উন্নতি করতে পারে। সহায়তা কাউন্সেলিং পরিষেবা এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রামগুলি রোগীদের ও তাদের পরিবারকে আরও সচেতন ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। এদিক বিবেচনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সম্প্রচার আরও বেশি কার্যকরী হতে পার।

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল প্রাথমিক সনাক্তকরণ। জেনেটিক কাউন্সেলিং ব্যক্তিদের তাদের শিশুদের থ্যালাসেমিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি বুঝতে এবং সাহায্য করতে পারে। প্রসবপূর্ব পরীক্ষা দম্পতিদের তাদের অনাগত সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে সক্ষম করে, যা সময়মত হস্তক্ষেপ এবং ব্যবস্থাপনার গ্রহণ করার জন্য উপকারী একটি উপায়। 

যদিও থ্যালাসেমিয়ায় রক্ত সঞ্চালন একটি প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিকল্প পন্থা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য শুধুমাত্র ট্রান্সফিউশনের উপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দরজা খুলে দিচ্ছে। 

জিন থেরাপির সম্ভাব্য অগ্রগতি থেকে শুরু করে BMT-এর মতো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা, আয়রন চিলেশন থেরাপি এবং হোলিস্টিক সাপোর্ট সিস্টেমের সাথে পদ্ধতি বাংলাদেশের মতো সম্পদ-সীমিত দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নতুন আশা এবং উন্নত জীবনের মান নিয়ে আসতে পারে। এই বিকল্প পন্থাগুলি গ্রহণ করা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

এরকম আরো ব্লগ করতে ক্লিক করুন।  

 

লেখিকা

তারিন আলম স্বর্ণা

ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ট

YSSE