মেডিকেল কলেজ পড়ুয়া ছেলেটির পড়াশোনায় মন নেই, নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই, দিনের পর দিন ক্লাসে অনুপস্থিত। শিক্ষক এবং বন্ধুবান্ধবদের একটাই ভাবনা, “হোস্টেল রুমের দরজা বন্ধ করে সারাদিন কি করে ছেলেটি? বখে গেল না তো?” সেই ছেলেটিই একদিন বাংলাভাষীদের দারুন এক সফটওয়ার উপহার দিলেন- অভ্র, বাংলা রাইটিং কীবোর্ড।
অভ্র মানে আকাশ। ১৮ বছর বয়সে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা সেই ছেলেটির নাম মেহেদী হাসান খান। যিনি অভ্র কীবোর্ডের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। অভ্রর দৌলতে আজ সুদূর তানজানিয়া থেকে রাশিয়া, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে বাঙালি তার মনের কথা জানাতে পারেন খাঁটি বাংলা ভাষায় লিখে। বাংলা লেখার এই সফটওয়্যারটিই আজকের বাংলা টাইপিস্টদের নিকট অতি পরিচিত যার জন্য আলাদা কোনো কীবোর্ড লাগে না, আলাদা করে টাইপিংও শিখতে হয় না। উচ্চারণ ভিত্তিক এই সফটওয়্যারে ব্যবহারকারীরা শুধু ইংরেজি অক্ষরে মনের কথাটি লিখছেন আর তা অভ্রের যাদুতে বাংলায় হাসছে। যেমন, কীবোর্ডে “ami banglay gan gai” টাইপ করা হলে, স্ক্রিনে দেখা যাবে “আমি বাংলায় গান গাই”। “ami banglake valobasi” টাইপ করা হলে স্ক্রিনে তা ধরা দেবে “আমি বাংলাকে ভালোবাসি” হিসেবে। কত সহজ, তাই না?
কিন্তু কয়েক বছর আগেও মোবাইল বা কম্পিউটারে বাংলা লেখাটা কিন্তু এত সহজ ছিল না। এজন্য আলাদা করে বাংলা টাইপিং শিখতে হতো। ইংরেজি টাইপিং এর মত বাংলা টাইপিং শেখো, তারপর অনুশীলন করো, আস্তে আস্তে আয়ত্বে আনো, তারপর চেষ্টা করে দেখো.. কত শতেক ঝামেলা! মেহেদী তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র। কম্পিউটারে বাংলা লিখতে তার খুব অসুবিধা হয়। যেভাবে লেখা হয় সে পদ্ধতিটিও তার পছন্দ নয়। তাই মেহেদী ভাবলেন আলাদা কোনো কীবোর্ড ছাড়াই ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লেখা যায় কিনা। যেই ভাবা সেই কাজ। এনাটমি, ফিজিওলজির বই একপাশে সরিয়ে রেখে ঝুকে পড়লেন কম্পিউটারে। শরীরের যত্ন নেই, নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই। ক্লাস, ক্যাম্পাস মাতিয়ে বেড়ানো হাসিখুশি ছেলেটা কেমন ঘরকুনো হয়ে গেল। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন কম্পিউটারে মুখ গুজে পড়ে থাকে। শিক্ষকরা ভাবলেন ছেলেটি বুঝি উচ্ছন্নে গেল। ডাক্তারি পড়তে এসে এত অনিয়ম করলে কি চলে? এরকম চলতে থাকলে তো ছেলেটা ডাক্তার হতে পারবে না। মেডিকেল কলেজের শিক্ষকরা বিরক্ত হয়ে বললেন, ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিতে।
কিন্তু মেহেদী তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। যে ভাষার জন্য রফিক, সালাম, বরকতেরা জীবন দিয়েছেন সেই ভাষাকে সহজভাবে লেখার জন্য তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যেতে লাগলেন। নাওয়া খাওয়া ,ঘুম, পড়াশোনা কোনোদিকে কোনো খেয়াল রইলো না। এই অমানুষিক পরিশ্রমের পর, অবশেষে ২০০৩ সালের ২৬ শে মার্চ মেহেদী সারা পৃথিবীর সামনে নিয়ে এলেন সবচেয়ে সহজ রাইটিং সফটওয়্যার- অভ্র কীবোর্ড, যে কীবোর্ড সহজ করেছে বাংলা লেখাকে, সহজ করেছে বাংলাভাষীদের জীবনকে।
আজ যেকোনো বাঙালীর কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ওপেন করলেই স্ক্রিনে একটি স্লোগান ভেসে ওঠে, “ভাষা হোক উন্মুক্ত”। উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। কারণ মেহেদী এই সফটওয়্যারটি বাঙালিদের হাতে তুলে দেয়ার বিনিময়ে কোনো অর্থ দাবি করেন নি। তার একটাই কথা, “ভাষার জন্য টাকা নেব কেন?” আজ অভ্র ব্যবহার করে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটারে বাঙ্গালীরা মনের ভাব প্রকাশ করছে, প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ভালবাসার কথা জানাতে পারছে খাঁটি বাংলা ভাষায় লিখে। নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে আমাদের পরিচয়পত্র বানাচ্ছে, অভ্র ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে পাসপোর্ট।আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোথায় নেই অভ্র?
মেহেদীর আবিষ্কার সর্বত্র ছড়িয়ে গেলেও নিঃস্বার্থ এই মানুষটি রয়ে গেছেন প্রচারের আড়ালে।শিক্ষকদের ভুল প্রমাণ করে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাশ করলেও চিকিৎসাকে তিনি পেশা হিসেবে নেননি। প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি ভালোবাসাটা তার রয়ে গেছে আগের মতোনই। তাই পেশা হিসেবে নিয়েছেন সেটাকেই। নিজের মতো, নিভৃতচারী জীবন কাটাচ্ছেন এই ভাষা সৈনিক।
লেখকঃ
আতিয়া আলম নিসা
ইন্টার্ন, কন্টেন্ট রাইটিং ডিপার্টমেন্ড।
Youth School for Social Entrepreneurs (YSSE)
এরকম আরও অনেক ব্লগ পড়ার জন্য ক্লিক করুন
*
